মণিপুরে ফের রক্তগঙ্গা! দুই দিনে ৭ খুন, কুকি ও নাগার রক্তক্ষয়ী সংঘাতে কোন ভয়ানক রহস্য লুকিয়ে?

গত কয়েক বছর ধরে চলা মেইতেই ও কুকি জনজাতির জাতিগত সংঘর্ষের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি। তার মধ্যেই মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে শুরু হয়েছে নতুন এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত। এবার সংঘর্ষের অনল ছড়িয়ে পড়েছে কুকি-জো এবং তাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে। গত কয়েকদিনের ধারাবাহিক হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন একাধিক সাধারণ মানুষ। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে শনি ও রবিবার শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি সশস্ত্র হামলায় মোট সাতজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যা নতুন করে গোটা রাজ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

গত ২১শে সেপ্টেম্বর খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে তামেই শহরের দিকে যাওয়ার পথে ১৭ বছর বয়সী একাদশ শ্রেণির ছাত্র এনকে উইফেনবোকে গুলি করে হত্যা করে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা। লিয়াংমাই নাগা সম্প্রদায়ের এই কিশোরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শোকস্তব্ধ তার পরিবার। এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে ১৫ই সেপ্টেম্বর তামেংলং জেলার লেইসাংফাই গ্রামে মাঠে কর্মরত দুই নারীকে কুপিয়ে ও গুলি করে খুন করা হয়। নিহত ৬০ বছর বয়সী চোঙ্গা সিটলহৌ এবং ৩০ বছর বয়সী সদ্য নার্সিং পাস করা কিমবোই সিংসন কুকি সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। শুধু এই ঘটনাই নয়, গত শনি ও রবিবারে সেনাপতি জেলার কালেনজাং গ্রামের প্রধানের বাড়িতে চলা হামলায় নাগা সম্প্রদায়ের তিন সহকর্মীসহ মোট সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।

সংঘাতের নেপথ্যে কী কারণ?

দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতপ্রবণ মণিপুরের এই পরিস্থিতির মূলে রয়েছে দীর্ঘ পুরনো ভূমি এবং আঞ্চলিক অধিকারের লড়াই। মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিগত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকেই পার্বত্য অঞ্চলের দুই জনজাতির মধ্যে জমি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। নাগা অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে কুকিদের বিস্তার এবং নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টাকে কেন্দ্র করেই এই রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যেও দুই জনজাতির মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে শত শত মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছিলেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে উখরুল জেলার একটি ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের যুবকদের মধ্যে বচসা শুরু হয়, যা পরে বড় আকারের সহিংসতায় রূপ নেয়। বর্তমান এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দুই পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে। নাগা সংগঠনগুলির দাবি, কুকি কট্টরপন্থীরা পরিকল্পিতভাবে নিরীহ নাগাদের হত্যা করছে এবং তারা এর নেপথ্যে থাকা ‘সাসপেনশন অব অপারেশনস’ চুক্তির তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। অন্যদিকে, কুকি ইম্পি মণিপুরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তাংখুল নাগা কট্টরপন্থীরা বৃহত্তর নাগালিমের দাবি পূরণ করতে এবং পার্বত্য অঞ্চলে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পদক্ষেপ

পরিস্থিতি সামাল দিতে মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে আসাম রাইফেলস, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাজার হাজার জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধীদের গ্রেফতারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং বেশ কিছু গুরুতর মামলার তদন্তভার জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-র হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এদিকে, গত প্রায় ছ’মাস ধরে নাগা সংগঠনের তরফে জাতীয় সড়কে চলা অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা করা হলেও, সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফেরাতে এবং স্থায়ী শান্তি স্থাপন করতে প্রশাসনকে যে আরও দীর্ঘ পথ চলতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।