লাল-নীল ভুলে নতুন সমীকরণ! সিপিএমের সঙ্গে মমতার এই মেলামেশা কি বাংলার রাজনীতিতে বড় কোনো পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত?

বঙ্গ রাজনীতির সমীকরণ দিনকে দিন যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চর্চার অন্ত নেই। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক পরিচয় মূলত তৈরি হয়েছিল বাম জমানার কড়া বিকল্প হিসেবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সেই চিত্রটাই যেন সম্পূর্ণ বদলে যেতে বসেছে। একসময়ের তীব্র রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বৃহত্তর পরিসরে বৃহত্তর জোট গড়ার তৎপরতা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বঙ্গ রাজনীতির ঘাঁতঘোঁত যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, তাঁরা অনেকেই মনে করেন যে তৃণমূল কংগ্রেস প্রথাগত দলের চেয়ে অনেক বেশি একটি আন্দোলনভিত্তিক বিরোধী মঞ্চ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। কংগ্রেস শিবির ত্যাগ করার পর বামেদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের মাধ্যমেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ রাজ্যে নিজের রাজনৈতিক জমি শক্ত করেছিলেন। অথচ আজ রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রয়োজনে সেই সিপিআইএম নেতৃত্বের সঙ্গেই তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসছে। সাম্প্রতিক অতীতে তাঁর মুখে শোনা গিয়েছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের ফারাক দূরে সরিয়ে রেখে প্রয়োজনে দলমত নির্বিশেষে একযোগে কাজ করার বার্তা।
ইতিহাসের পাতা উলটে দেখলে স্পষ্ট হয়, একসময়ে যে কংগ্রেস দল ছেড়ে তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন, পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্তরে সেই দলকেই ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ছাতার তলায় জায়গা করে নিতে দেখা গিয়েছে। যদিও রাজ্যের রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে প্রদেশ কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা বা অন্যান্য ইস্যুতে অতীতে খুব একটা ছাড় দিতে দেখা যায়নি। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে সময় লাগে না। অতীতে দেখা গিয়েছে, নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন জানানোর মতো কৌশলগত সিদ্ধান্তও নিয়েছেন তিনি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে এবং বিরোধীদের মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি করার উদ্দেশ্যেই কি এই রণকৌশল বদল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বহু দশক ধরে বাংলার রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বামপন্থীরা একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে এসেছে। বামফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটানোর প্রতিশ্রুতি এবং তাদের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলনের উপরেই ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভিত্তি। সিপিএমের কড়া বিরোধিতাই ছিল বিগত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মমতার মূল রাজনৈতিক পরিচয়। আজ সেই অবস্থানের খানিকটা পরিবর্তন ঘটিয়ে বাম শিবিরের দিকে যোগাযোগের বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমের সামনে জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় এবং স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলির একটি যৌথ কৌশল নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে। এই বিষয়ে বিরোধী দলগুলির কাছে চিঠি পাঠানোর পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফ থেকে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়। সংবাদমাধ্যমের সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, এরপর দুই নেতার মধ্যে ফোনে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলিকে একই মঞ্চে বা একজোট করার সম্ভাবনা নিয়ে এই ফোনালাপে আলোচনা হয়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা।