বিজলি নেই, পাকা রাস্তা নেই, রয়েছে চিতাবাঘের ভয়! তবুও কেন ১৩ বছর ধরে এই দুর্গম পাহাড়ি পথে একা হেঁটে চলেছেন এই মাস্টারমশাই?

ভারতজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্রটা মূলত শহুরে সুযোগ-সুবিধা আর পাকা রাস্তার ওপর নির্ভরশীল। বেশিরভাগ শিক্ষকই সকালে নিজেদের গাড়ি কিংবা বাসে চেপে স্কুল চত্বরে পৌঁছান এবং ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান করেন। কিন্তু আমাদের দেশেই এমন এক রাজ্য রয়েছে, যেখানকার এক শিক্ষককে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘন জঙ্গল, খাদের ধার, বৃষ্টি আর হিংস্র বন্য জন্তুর ভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৫ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে তবেই একটি প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলে পৌঁছাতে হয়।

মহারাষ্ট্রের কোলাপুর জেলার এই অদম্য এবং সংগ্রামী শিক্ষকটির নাম জীবন মিথারী। ৫৫ বছর বয়সি জীবন মিথারী প্রতিদিন যে দুর্গম পথ পেরিয়ে স্কুলে যান, তা যে কারও বুক কাঁপিয়ে দেবে। তবে এর চেয়েও বড় ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, তিনি যে স্কুলে শিক্ষকতা করেন, সেখানে মাত্র একজনই শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তবুও সেই একটিমাত্র শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই শিক্ষক প্রতিদিন নিয়মিত স্কুলে হাজির হন।

কোলাপুর জেলার গগনবাওড়া তালুকদার অন্তর্গত ‘কওয়ালটেক ধনাগড়ওয়াড়া’ নামের অত্যন্ত অবহেলিত একটি এলাকার জেলা পরিষদ প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন জীবন মিথারী। সিন্ধুদুর্গ সীমানার কাছাকাছি অবস্থিত এই দুর্গম গ্রামে আজও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, এমনকি গাড়ি যাতায়াতের মতো কোনো পাকা রাস্তাও নেই। মূল সড়ক থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত এই স্কুলে পৌঁছাতে গিয়ে জীবন মিথারী আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রতিদিন মোট পাঁচ কিলোমিটার জঙ্গলপথ পায়ে হাঁটেন। সংবাদমাধ্যমের কাছে জীবন মিথারী নিজেই জানিয়েছেন যে, ২০১৩ সালের ২৬ জুলাই তিনি প্রথম এই স্কুলে পা রেখেছিলেন এবং তারপর থেকে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে নিরলসভাবে এই একক দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। অতীতে তিনি কোলাপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমবায় ব্যাংকের সভাপতি হিসেবেও অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব সামলেছিলেন।

এই দুর্গম এলাকায় পোস্টিং নেওয়ার পেছনের গল্পটি আরও বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক। একবার তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন যে, প্রভাবশালী ও রसूखদার শিক্ষকদের সবসময় শহর বা সহজলভ্য এলাকায় পোস্টিং দেওয়া হয়, আর সাধারণ ও কম প্রভাবশালী শিক্ষকদেরই কেবল এই ধরনের দুর্গম এলাকায় পাঠানো হয়। সহকর্মীদের এই কটূক্তি জীবন মিথারীর মনে গভীর আঘাত হানে এবং তিনি একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি নিজে থেকেই সরকারের কাছে আবেদন করে এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজের বদলি করিয়ে নেন। একসময় এই কওয়ালটেক ও আনন্দুর ধনাগড়ওয়াড়া এলাকায় প্রায় ৭০ থেকে ১০০টি পরিবারের বসবাস ছিল এবং শিশুদের সংখ্যাও বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু কর্মসংস্থান ও জীবিকার খোঁজে এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে কোলাপুর শহরের দিকে বড় পরিসরে অভিবাসন শুরু করায় জনবসতি কমতে থাকে। ফলস্বরূপ, এই বছর স্কুলটিতে সরকারি খাতায় মাত্র একজনই ছাত্রী রয়েছে, যার নাম স্বরা বোড়কে এবং সে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। ছাত্রসংখ্যা মাত্র একজন হলেও শিক্ষক জীবন মিথারীর কাছে শিক্ষাদানের ব্রত একটুও ম্লান হয়নি; তাঁর মতে, পড়ুয়ার সংখ্যা যতই হোক, শিক্ষক হিসেবে নিজের পবিত্র কর্তব্য পালন করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

স্কুলে যাতায়াতের এই কঠিন পথ সবসময় মারাত্মক বিপদসংকুল। বন্য জন্তু যেমন গৌড় বা বাইসন এবং চিতাবাঘ প্রায়শই এই জঙ্গলপথে ঘুরে বেড়ায়। বন্য প্রাণীর আক্রমণের আশঙ্কায় বন বিভাগ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাঁকে সবসময় সতর্ক করে বলেছেন যে, যাতায়াতের সময় যেন তিনি জঙ্গলে কোথাও না থামেন এবং একটানা হেঁটে পথ পার হন। এই এলাকা থেকে পরবর্তী ১১ কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো স্কুল নেই, তাই মনসুন বা বর্ষার মরশুমে ছোট শিশুর পক্ষে এত দীর্ঘ পথ একা পাড়ি দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। এই চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই জীবন মিথারী আগামী ২০২৯ সালের মে মাসে তাঁর চাকরি থেকে অবসর নেওয়া পর্যন্ত এভাবেই অবিরাম নিজের দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।