আমেরিকাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ! ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বড় ঘোষণা, তবে কি বদলাচ্ছে ভারতের কূটনৈতির চাল?

ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের যৌথ ঘোষণা প্রকাশ পেতেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা। এই ঘোষণাপত্রে ফোরামের সদস্য দেশগুলো বেশ কিছু ইস্যুতে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে লেবাননের চলমান সংকটে সরাসরি ইজরায়েলের সমালোচনা করে সেখানে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার কঠোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমেরিকার একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপের তীব্র সমালোচনা করা হলেও ওই ঘোষণাপত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম কোথাও সরাসরি উচ্চারণ করা হয়নি। চলতি বছর ব্রিকস গোষ্ঠীর প্রেসিডেন্সি এবং সম্মেলনের সফল আয়োজক ও স্বাগতিক দেশ হিসেবে ভারতের ওপর একটি অত্যন্ত জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল—সমস্ত সদস্য দেশের পারস্পরিক বিরোধ ভুলে এই যৌথ বিবৃতিতে সর্বসম্মতভাবে রাজি করানো।
বিশ্লেষকদের মতে, অত্যন্ত সুকৌশলী ও মাপা শব্দচয়নের মাধ্যমেই এই ভারসাম্যপূর্ণ যৌথ বিবৃতি তৈরি করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী একতরফা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সীমার বাইরে গিয়ে চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কড়া নিন্দা করা হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দেশকে নিশানা করা হয়নি। একইভাবে, পরমাণু ও পারমাণবিক স্থাপনার ওপর হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হলেও সেখানে সরাসরি ইরানের নাম এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইজরায়েলের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি নাম নিয়েই সরব হয়েছে ব্রিকস। গাজা ও লেবাননের ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং সেখানে মানবিক সাহায্য নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ইজরায়েলের ওপর স্পষ্ট আইনি দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান ও দাবি সত্ত্বেও সমস্ত দেশকে এক টেবিলে বসিয়ে এই সর্বসম্মত যৌথ ঘোষণা আদায় করাকে ভারতের এক বিরাট ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা যে রাশিয়া ও ইরান হয়তো আমেরিকার বিরুদ্ধে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা ভারত ও অন্যান্য সদস্য দেশের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব হতো। কিন্তু নয়াদিল্লির দক্ষ মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত সমস্ত সদস্য দেশ একটি অভিন্ন ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
বিশেষ করে একতরফা অর্থনৈতিক ও গৌণ বাণিজ্যের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী যেকোনো একতরফা জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। এই ভাষাটি রাশিয়া এবং ইরানের মতো দেশগুলোর দীর্ঘদিনের মূল দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যাদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময় কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একতরফা শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপের নীতির বিরুদ্ধেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিকস।
পরিশেষে বলা চলে, এই কঠোর ও আক্রমণাত্মক ভাষা সত্ত্বেও ব্রিকসের এই যৌথ ঘোষণা আদতে ভারতের দীর্ঘদিনের স্বনির্ভর ও স্বাধীন বৈদেশিক নীতিতে কোনো মৌলিক বা গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। এটি কেবল ১১টি সদস্য দেশের যৌথ ঐকমত্যের একটি দলিলমাত্র। সভাপতি হিসেবে ভারতের মূল দায়িত্ব ছিল জটিল ও বৈপরীত্যে ভরা স্বার্থের মধ্য থেকেও একটি সর্বজনগ্রাহ্য রূপরেখা তৈরি করা। একদিকে ফিলিস্তিনের জন্য ‘টু-স্টেট সলিউশন’ বা দ্বিজাতি তত্ত্বের জোরালো সমর্থন এবং অন্যদিকে ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সুসম্পর্ক বজায় রেখে ভারত প্রমাণ করে দিয়েছে যে কঠিন বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও নয়াদিল্লি সফলভাবে এক নিখুঁত কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সম্পূর্ণ সক্ষম।