মণিপুরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত! কালিয়া দিবসের দিনই জঙ্গিদের বর্বরোচিত হামলায় শিশু ও দুই মহিলা-সহ চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু

মণিপুরে ফের রক্তাক্ত হলো উপত্যকা। সন্দেহভাজন জঙ্গিদের বর্বরোচিত হামলায় দুই মহিলা সহ অন্তত চারজন সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, তামেনগ্লং ও নোনি জেলায় পরপর দুটি বড় হামলার জেরে গোটা রাজ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম হামলাটি ঘটে তামেনগ্লংয়ের একটি গ্রামে ভোর চারটে নাগাদ, যাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দু’জন। এর ঠিক বারো ঘণ্টা বাদে নোনি জেলায় ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় আরেকটি রক্তক্ষয়ী হামলায় আরও দুজনের প্রাণহানি হয়। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ ও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচন্দ সিং। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর এই ধরনের হিংসা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত এবং তা কিছুতেই বরদাস্ত করা হবে না।

বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে, মণিপুরের কুকি সম্প্রদায়ের ‘সাহনিত নি’ বা ‘কালা দিবস’ পালনের ঠিক মাঝেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে। নব্বইয়ের দশকের সংবেদনশীল সময়ে কুক্ষি-নাগা জাতিগত সংঘাতে প্রাণ হারানো মানুষগুলির স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ১৩ সেপ্টেম্বর এই কালো দিবস পালন করা হয়। ইম্ফল ও জিরিবাম সংযোগকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এনএইচ-৩৭ (NH-37) জাতীয় সড়কের নিকটবর্তী টোলেন কুকি গ্রামে সশস্ত্র জঙ্গিরা অতর্কিত হানা দেয়। সেই হামলায় লিংগাই সিংসিট নামের এক মহিলা ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং তাঁর স্বামী সেইনেই সিংসিট ও একটি ছোট শিশু গুরুতর জখম হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, বর্বরোচিত এই ঘটনার পরপরই দ্রুত নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী অসমের শিলচর হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় জখম সেইনেইয়েরও মৃত্যু হয়। স্থানীয় কাইমাই গ্রাম কর্তৃপক্ষের তরফে এই রক্তক্ষয়ী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ও অশান্তি সৃষ্টির একটি সুপরিকল্পিত ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা, দ্রুত অভিযুক্তদের শনাক্তকরণ এবং কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে গ্রাম কর্তৃপক্ষ।

এর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ রবিবার বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ নুংবা থানার অন্তর্গত লংপি গ্রামে ঘটে চলা দ্বিতীয় বর্বরোচিত হামলায় সশস্ত্র জঙ্গিদের নির্বিচার গুলিতে এক মহিলা সহ আরও দুজন প্রাণ হারিয়েছেন। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, এই দফায় নিহতদের নাম জুলি গাংতে এবং আর গাংতে। মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক জোরালো বিবৃতিতে মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচন্দ সিং এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

এই চরম রক্তপাতের পর নড়েচড়ে বসেছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলও। বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং এবং নাগা পিপলস ফ্রন্টের বিধায়ক আওয়াংবাউ নিউমাই এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক কড়া বার্তায় বীরেন সিং উল্লেখ করেছেন যে, টোলেন কুকি গ্রামের এই মর্মান্তিক ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হৃদয়বিদারক। তাঁর মতে, নিরপরাধ মানুষের সুরক্ষাই সবার আগে হওয়া উচিত এবং এই ধরণের হিংসা শান্তির প্রক্রিয়াকে দুর্বল করছে। প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের চলমান জাতিগত সংঘাতে এযাবৎ অন্তত ৩০৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তাকে প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।