ফ্রান্সের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি! চন্দননগরকে ঘিরে বাংলার মুকুটে জুড়তে চলেছে বিশ্বমানের পর্যটনের নতুন পালক

বাংলার বুকে লুকিয়ে থাকা ফরাসি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে তুলে ধরতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপে মুমোহর দিল রাজ্য সরকার। একসময়ের ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর তথা সমগ্র হুগলি জেলাকে বিশ্বমানের পর্যটন মানচিত্রে স্থান দিতে ফ্রান্স সরকারের সঙ্গে পর্যটন দফতরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতাপত্র (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুক্রবার থেকেই চন্দননগরে তিন দিনব্যাপী এক বর্ণাঢ্য ফরাসি উৎসবের জমকালো সূচনা করা হয়েছে। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ এবং ভারতে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত থিয়েরি ম্যাথু। ফরাসি আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক ‘দ্য রেজিস্ট্রি ভবন’-এর আধুনিক সংস্কার থেকে শুরু করে জলপথ নির্ভর আন্তর্জাতিক ট্যুরিজম সার্কিট গড়ে তোলার মতো একাধিক মেগা প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে, যা বাংলার পর্যটন শিল্পে এক নতুন বিপ্লব ঘটাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

চন্দননগরের ফরাসি আমলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ঐতিহাসিক ‘দ্য রেজিস্ট্রি ভবনে’র সংস্কারের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পর্যটন দফতরের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, ফ্রান্স সরকারের সার্বিক সহযোগিতা ও ব্যবস্থাপনায় এই প্রাচীন ভবনের আদি ও অকৃত্রিম রূপ ফিরিয়ে আনা হবে। এই ধরনের বহুমুখী হেরিটেজ সংরক্ষণের কাজের মাধ্যমে ভবিষ্যতে হেরিটেজ ট্যুরিজমের ক্ষেত্র আরও অনেক বেশি প্রশস্ত হবে। শুধু চন্দননগর একা নয়, হুগলি নদীর দুই তীরে অবস্থিত চুঁচুড়ার ডাচ ইতিহাস, ব্যান্ডেলের পর্তুগিজ ঐতিহ্য, শ্রীরামপুরের ডেনিস সংস্কৃতি এবং ব্যারাকপুরের ব্রিটিশ আমলের স্মৃতিবিজড়িত অঞ্চলগুলিকে একসঙ্গে জুড়ে একটি বিশাল ইউরোপীয় কলোনি পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। মূলত ইউরোপীয় পর্যটকদের আকর্ষণ করতেই এই জলপথ নির্ভর ট্যুরিজম সার্কিট তৈরির রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে।

এদিনের অনুষ্ঠানে ভারতের সঙ্গে ফ্রান্সের গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে ফরাসি রাষ্ট্রদূত থিয়েরি ম্যাথু পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও পর্যটন দফতরকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে আগামী দিনে আরও বেশি করে ফরাসি পর্যটক, গবেষক ও ঐতিহাসিকরা বাংলায় ছুটে আসবেন। এমনকি আগামী বছর থেকে চন্দননগরে নিয়মিতভাবে বার্ষিক ফরাসি উৎসব আয়োজনের প্রস্তাবও তিনি পর্যটন মন্ত্রীর কাছে পেশ করেছেন। রাষ্ট্রদূত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে ফ্রান্স থেকে ভারতে বিনিয়োগের মূল কেন্দ্র মুম্বই হলেও, তাঁদের পরবর্তী লক্ষ্য হল সরাসরি কলকাতায় ফরাসি বিনিয়োগ নিয়ে আসা। এর হাত ধরেই ভবিষ্যতে কলকাতা থেকে ফ্রান্সে সরাসরি বিমান বা যাতায়াত পরিষেবা চালু হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ নিজের বক্তব্যে বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও মাটির প্রতি শ্রদ্ধার উপর জোর দিয়ে বলেন, শেকড় বা অতীতকে ভালো না বাসলে জীবনে কখনোই সফল হওয়া যায় না। সাবেক ফরাসি অধিবাসীদের উত্তরপুরুষরা ভবিষ্যতে যখনই বাংলায় আসবেন, তাঁরা যেন এখানকার পরিবর্তন ও উন্নয়ন স্বচক্ষে দেখতে পান, সেই লক্ষ্যেই সরকার কাজ করে চলেছে। জলপথের মাধ্যমেই ঐতিহাসিক শহরগুলিকে এক সুতোয় বেঁধে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সামনে বাংলাকে এক অনন্য পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার এই উদ্যোগ রাজ্যকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন পরিচিতি দেবে বলেই ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা।