দুর্নীতির তদন্ত ও বেতনের টানাপোড়েন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পদ ছাড়লেন শেখ হাসিনার কন্যা!

আন্তর্জাতিক মহলে চরম চাঞ্চল্য তৈরি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক ডিরেক্টর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ। গত ৯ সেপ্টেম্বর সরাসরি WHO-এর ডিরেক্টর জেনারেল টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসুসের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে চলা আর্থিক অনিয়মের অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার আবহে এই পদত্যাগ বিশ্ব রাজনীতি ও স্বাস্থ্য মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
সূত্রের খবর, সায়মা ওয়াজেদের ইস্তফার ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ গত ৮ সেপ্টেম্বর WHO-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কমিটি তাঁর নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করেছিল। এই সুপারিশ পরবর্তীতে সংস্থার এগজিকিউটিভ বোর্ডের বিবেচনায় যাওয়ার কথা থাকলেও, তার আগেই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পদত্যাগপত্রে বর্তমান নেতৃত্বের ওপর অনাস্থার কথা স্পষ্ট জানিয়ে তিনি দাবি করেছেন যে, দীর্ঘ সময় বেতন না পাওয়ার কারণে তিনি মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিলেন। প্রায় এক বছর ধরে বেতন বন্ধ থাকায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও কাজের পরিবেশ সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
উল্লেখ্য, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সায়মাকে WHO-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দফতরের দায়িত্ব থেকে বাধ্যতামূলক বেতনহীন ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলার পরই এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এরও আগে, ২০২৫ সালের মার্চের দিকে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহার, প্রতারণা এবং জালিয়াতির অভিযোগে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করে।
অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই পুরো বিষয়টি সংস্থার সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে। আঞ্চলিক কমিটির সদস্য এবং এগজিকিউটিভ বোর্ডকে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে অবগত করা হয়েছে। সংস্থার দাবি, প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতি সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার ও যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে, যেখানে সংগঠনের স্বার্থ এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে বিপুল ভোটাভোটিতে সায়মা ওয়াজেদ WHO-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক ডিরেক্টর পদে নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালের শুরুর দিকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর এই পাঁচ বছরের মেয়াদী কার্যকাল শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মাঝপথেই তার অবসান ঘটল। তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগের পর আপাতত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক দফতরের অফিসারের ইন-চার্জ (Officer-in-Charge) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন নিলেশ বুদ্ধ। নতুন স্থায়ী আঞ্চলিক ডিরেক্টর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিনিই এই পদের যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালনা করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই তাঁর পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও আইনি তদন্ত শুরু হয়েছে। সেই জটিল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার শীর্ষ পদে থেকে দুর্নীতির মুখোমুখি হওয়ার চাপ সায়মার কেরিয়ারে বড় ধাক্কা দিল। WHO-র আঞ্চলিক প্রধানের পদ থেকে তাঁর এই প্রস্থান বিতর্ককে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে এবং আগামী দিনে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কূটনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।