ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বিরাট সুখবর! বিদেশি গ্রাহকদের থেকে পেমেন্ট তোলা এবার আরও সহজ করল জিও

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা প্রসারিত করার পথ আরও সুগম ও সহজ করতে এক অভিনব ও যুগান্তকারী পরিষেবা চালু করল রিলায়েন্সের অধীনস্থ ‘জিও পেমেন্ট সলিউশন্স লিমিটেড’ (JPSL)। জিও ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন এই সংস্থাটি এবার দেশের সমস্ত ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বিদেশি গ্রাহকদের কাছ থেকে খুব সহজেই পেমেন্ট গ্রহণ করার বিশেষ সুবিধা নিয়ে এসেছে। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে ব্যবসায়ীরা এখন থেকে অত্যন্ত নির্বিঘ্নে ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট, আন্তর্জাতিক কার্ড এবং বিভিন্ন দেশের স্থানীয় পেমেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি টাকা লেনদেন করতে পারবেন।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা আরবিআই (RBI)-র কাছ থেকে ‘ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট এগ্রিগেটর’ (PA-CB)—অর্থাৎ আন্তর্জাতিক লেনদেনের পেমেন্ট সংগ্রহের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত সংস্থা হিসেবে ছাড়পত্র পাওয়ার পরেই এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা বাজারে আনল JPSL। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই অনুমোদনের আওতায় রপ্তানি ও আমদানি—উভয় ধরনের বর্তমান অ্যাকাউন্টের অনুমোদিত লেনদেনই সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনলাইন বিক্রেতা, ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, বিভিন্ন উদীয়মান ডিজিটাল ব্যবসা এবং এসএএএস (SaaS)—অর্থাৎ ইন্টারনেটের মাধ্যমে সফটওয়্যার পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলি খুব দ্রুত বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। কিন্তু অতীতে বিদেশ থেকে পেমেন্ট বা টাকা তোলার ক্ষেত্রে একাধিক জটিল পেমেন্ট সংস্থার মারপ্যাঁচ, আলাদা আলাদা মুদ্রা পরিবর্তনের হাড়ভাখা খাটুনি, অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা দেওয়া এবং হিসাব মেলানোর নানা ঝক্কির মুখে পড়তে হতো ভারতীয় উদ্যোক্তাদের। JPSL-এর নতুন এই আধুনিক পরিষেবার মূল লক্ষ্য হলো দেশীয় ব্যবসায়ীদের এই দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যাগুলি চিরতরে দূর করা।
সংস্থার পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হয়েছে যে, তাদের এই অত্যাধুনিক আন্তর্জাতিক পেমেন্ট পরিষেবা একা হাতেই ভারতের মোট রপ্তানি বাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ কভার করতে সক্ষম। এর ফলে আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপ, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত অর্থনৈতিক দেশগুলিতে ব্যবসা করা ভারতীয় সংস্থাগুলি এখন থেকে সম্পূর্ণ স্থানীয় মুদ্রায় পণ্যের দাম নির্ধারণ করে খুব সহজেই গ্রাহকদের কাছ থেকে পেমেন্ট সংগ্রহ করতে পারবে। শুধু তাই নয়, আগামী দিনে ল্যাটিন আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও বেশ কিছু নতুন দেশের স্থানীয় পেমেন্ট পদ্ধতি এই পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থার।
ছোট ও মাঝারি ব্যবসা (MSME) থেকে শুরু করে বড় মাপের ডিজিটাল সংস্থা—সব ধরনের উদ্যোগের কথা মাথায় রেখে এই প্ল্যাটফর্মে একাধিক লোভনীয় ও অত্যাধুনিক সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘হোস্টেড চেকআউট’ (ওয়েবসাইটে নিরাপদ পেমেন্টের ব্যবস্থা), ‘পেমেন্ট লিঙ্ক’ (সহজে লিঙ্কের মাধ্যমে টাকা তোলার সুবিধা), ‘পেমেন্ট পেজ’ (স্বতন্ত্র পেমেন্ট পেজ), ‘রিকারিং ইনভয়েসিং’ (নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্বয়ংক্রিয় বিল পাঠানোর সুবিধা), এসডিকে (অন্য সফটওয়্যার বা অ্যাপে পেমেন্ট ব্যবস্থা যুক্ত করার প্রযুক্তি) এবং ‘হোয়াইট-লেবেল এপিআই’ (নিজস্ব ব্র্যান্ডের নামে পেমেন্ট পরিষেবা যুক্ত করার প্রযুক্তি)।
গ্রাহক সন্তুষ্টির কথা মাথায় রেখে JPSL পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের এই নতুন পরিষেবায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ মূল্যের পাশাপাশি থাকবে ‘টি প্লাস টু সেটেলমেন্ট’ (T+2 Settlement)—অর্থাৎ লেনদেনের মাত্র দুই কর্মদিবসের মধ্যে টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার সুবিধা। সবচেয়ে বড় কথা, এই ব্যবস্থায় কোনো ধরনের ‘রোলিং রিজার্ভ’ (নিরাপত্তার জন্য ব্যবসায়ীর কিছু টাকা সাময়িক আটকে রাখা) থাকবে না। ফলে ব্যবসায়ীরা প্রতিটি লেনদেনের চক্রে তাঁদের সম্পূর্ণ প্রাপ্য টাকা কোনো রকম কাটছাঁট ছাড়াই হাতে পাবেন বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
নিরাপত্তার দিক থেকেও এই ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে। রিজার্ভ ব্যাংকের সমস্ত কঠোর নিয়ম মেনে ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’ (লেনদেনের তথ্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুরক্ষিত রাখা), স্থানীয় ডেটা স্টোরেজ এবং নিয়মিত ‘ট্রানজাকশন মনিটরিং’ করা হবে। একই কর্মদিবসে ‘ফিরা’ বা ‘ই-ফিরা’ (FIRA/eFIRA)—অর্থাৎ বিদেশ থেকে টাকা পাওয়ার দাপ্তরিক প্রমাণপত্র দেওয়ার পাশাপাশি একটি উন্নত ‘রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড’-এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা যেকোনো সময় তাঁদের সমস্ত পেমেন্ট ও টাকা জমার বর্তমান পরিস্থিতি সহজেই যাচাই করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, এই আন্তর্জাতিক পেমেন্ট পরিষেবাটিকে আরও নিখুঁত ও বিশ্বমানের করে তুলতে JPSL বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘সিটি’ (Citi)-র সঙ্গে হাত মিলিয়ে কৌশলগত অংশীদারিত্ব করেছে। সিটির সুবিশাল আন্তর্জাতিক ক্লিয়ারিং নেটওয়ার্ক এবং স্বয়ংক্রিয় নিয়ম মেনে লেনদেন যাচাই করার উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বিশ্ববাজারে ব্যবসা করার পথ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে দুই সংস্থাই যৌথভাবে কাজ করবে বলে জানা গেছে।