ব্রিটিশ আমলের জীর্ণ স্কুল থেকে বিশ্বমানের চিকিৎসা কেন্দ্র! আগ্রার এই নামী কলেজের ইতিহাস শুনলে চমকে যাবেন

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত উত্তরপ্রদেশের আগ্রার সরোজিনী নাইডু মেডিকেল কলেজটি আজ তার ১৭২ বছরের গৌরবময় ঐতিহাসিক পথচলার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সূচনার সময় এটি ‘থমসন স্কুল’ নামে পরিচিত ছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল চিকিৎসা সহকারী তৈরি করা এবং তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসা কর্মী সরবরাহ করা। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন সার্জন জন মারাই, এবং এর ঠিক তিন বছর পর ১৮৫৭ সালে ভারতীয় ডাক্তারদের প্রথম ব্যাচ এখান থেকে সফলভাবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং ১৮৭২ সালে সাধারণ বেসামরিক শিক্ষার্থীদের জন্যও এর দরজা খুলে দেওয়া হয়।

আগ্রার বিশিষ্ট ইতিহাসবিদদের মতে, ১৮৮৩ সালে নারী শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি পৃথক ও বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা সেই যুগে নারী শিক্ষার প্রসারে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো উন্নয়নে পরবর্তীতে বেশ কিছু ঐতিহাসিক সংযোজন ঘটে—যার মধ্যে ১৮৮৬ সালে নির্মিত হিলসন ওয়ার্ড এবং ১৮৯২ সালের আধুনিক অপারেটিং থিয়েটার, বহির্বিভাগ ও উইলকক্স ওয়ার্ড অন্যতম। এভাবেই একটি সাধারণ চিকিৎসা সহায়ক প্রতিষ্ঠান ক্রমান্বয়ে উত্তর ভারতের অন্যতম প্রধান ও প্রবীণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। ১৯৩৯ সালে আগ্রা মেডিকেল কলেজটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজের মর্যাদা লাভ করে আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় এবং সেখানে বহুল প্রতীক্ষিত এমবিবিএস কোর্স চালু করা হয়। ঐতিহাসিকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৪ সালে এখান থেকে প্রথম এমবিবিএস ব্যাচ সফলভাবে পাশ করে বের হয় এবং ১৯৪২ সালে প্রথম স্নাতকোত্তর কোর্সও চালু করা হয়েছিল, যা আধুনিক চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে।

স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ সালে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সরোজিনী নাইডু মেডিকেল কলেজ’। ভারতের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী, প্রথিতযশা কবি এবং উত্তরপ্রদেশের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল সরোজিনী নাইডুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এর সঙ্গে যুক্ত থমসন হাসপাতালের নামও পরিবর্তন করে সরোজিনী নাইডু হাসপাতাল করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি মর্যাদাপূর্ণ ‘মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’ এবং ব্রিটেনের ‘জেনারেল মেডিকেল কলেজ’ কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে এর আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। বর্তমানে এসএন মেডিকেল কলেজ এবং এর অধিভুক্ত হাসপাতালগুলো কেবল আগ্রার স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, বরং রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশসহ পার্শ্ববর্তী একাধিক রাজ্যের লাখ লাখ রোগীকে উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে আসছে। কলেজ প্রশাসনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে বর্তমানে প্রায় ৯৭৬টি ইনডোর বেড রয়েছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৩৯,০০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, পাশাপাশি বহির্বিভাগে প্রায় চার লক্ষ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়।

ইতিহাসবিদ অনুরাগ পালিওয়ালের বর্ণনা অনুযায়ী, এই মেডিকেল কলেজটিতে বর্তমানে মেডিসিন, সার্জারি, পেডিয়াট্রিক্স, গাইনোকোলজি ও অবস্টেট্রিক্স, অর্থোপেডিক্স, অফথালমোলজি, ইএনটি, ডার্মাটোলজি, সাইকিয়াট্রি, রেডিওলজি, প্যাথলজি এবং ইমার্জেন্সি মেডিসিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি কার্ডিওলজি, নিউরোলজি, নিউরোসার্জারি, নেফ্রোলজি, মেডিকেল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, ইউরোলজি, অনকোসার্জারি, সিটিভিএস এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ারের মতো অত্যাধুনিক সুপার-স্পেশালিটি পরিষেবাও রোগীদের প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার ক্রমাগত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে চালু হওয়া ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগে ৩২ শয্যাবিশিষ্ট লেভেল-২ এবং লেভেল-৩ আইসিইউ সুবিধা রয়েছে, যেখানে ভেন্টিলেটর, হাই-ফ্লো ন্যাসাল অক্সিজেন, পোর্টেবল আল্ট্রাসাউন্ড, ডিফিব্রিলেটর এবং ডায়ালাইসিসের মতো জীবনদায়ী ব্যবস্থা উপলব্ধ। এছাড়া কলেজের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বার্ন ইউনিট, মডিউলার ওটি এবং উন্নত রেডিওথেরাপি সুবিধার সম্প্রসারণের বিস্তারিত বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে। এসএন মেডিকেল কলেজের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি নতুন ২০০ শয্যার ট্রমা ও ইমার্জেন্সি ব্লক, একটি ৩০০ শয্যার সার্জিক্যাল অ্যালাইড ব্লক, একটি ৩০০ শয্যার মেডিসিন অ্যালাইড ব্লক এবং ১০০ শয্যার একটি বিশেষ ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্লক। একই সঙ্গে ২৫০ জন নতুন এমবিবিএস শিক্ষার্থীর জন্য একটি অত্যাধুনিক একাডেমিক ব্লক, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও ছাত্রাবাস গড়ে তোলা হচ্ছে, যা এই ১৭২ বছরের প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটিকে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক চিকিৎসার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করছে।