বর্ষার রাতে মাটির ঘরে সাক্ষাৎ যম! বিরল লিউসিস্টিক কালাচ উদ্ধার করে তাক লাগাল ট্রাস্ট

হাওড়া জেলার গ্রামীণ জনপদে বর্ষার মৌসুমে সাপের উপদ্রব নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় রীতিমতো থমকে গিয়েছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। হাওড়ার বাগনান থানার অন্তর্গত বাঁটুল গ্রামের এক সাধারণ মাটির বাড়ি থেকে সম্প্রতি উদ্ধার করা হয়েছে অত্যন্ত বিষধর, দুষ্প্রাপ্য ও চোখ ধাঁধানো একটি লিউসিস্টিক কালাচ সাপ (Leucistic Common Krait)। এই আকস্মিক আবিষ্কারের ফলে গোটা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার সূত্রপাত বর্ষার এক অন্ধকার রাতে। বাগনানের বাসিন্দা সঞ্জীব প্রামানিকের ঘরের মেঝেতে হঠাৎই একটি ধবধবে সাদা রঙের সাপ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। সাধারণত কালাচ বা কমন ক্রেইট সাপ কুচকুচে কালো কিংবা গাঢ় নীলচে রঙের হয়ে থাকে। কিন্তু চোখের সামনে সম্পূর্ণ ফ্যাকাশে বা বরফের মতো সাদা একটি সাপ দেখতে পেয়ে পরিবারের লোকজন চিৎকার করে ওঠেন। মুহূর্তের মধ্যে প্রতিবেশীরা ভিড় জমান সেখানে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত খবর দেওয়া হয় স্থানীয় বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠন ‘ওয়াইল্ডলাইফ এনভায়রনমেন্ট সেভিয়ার ট্রাস্ট’-এর সদস্যদের।
খবর পাওয়া মাত্রই সংগঠনের অভিজ্ঞ সদস্য চিত্রক প্রামানিক, সবুজ দোলুই, সুমন্ত দাস এবং অর্ঘ্য মল্লিক দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান। অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও চরম সতর্কতার সঙ্গে তাঁরা সাপটিকে কোনো রকম আঘাত না করে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এই কালাচ সাপটির রঙ এমন ধবধবে সাদা?
এ বিষয়ে উদ্ধারকারী দলের বিশেষজ্ঞরা জানান, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা বা অ্যালবিনো নয়। এটি আসলে ‘লিউসিজম’ (Leucism) নামক এক বিরল জেনেটিক মিউটেশনের ফলাফল। এই বিশেষ জন্মগত ত্রুটির কারণে জীবের শরীরে মেলানিনের মারাত্মক অভাব দেখা দেয়, যার ফলে ত্বক বা আঁশের স্বাভাবিক পিগমেন্টেশন নষ্ট হয়ে সাদা বা ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করে। তবে অ্যালবিনো সাপের চোখ সাধারণত লাল হয়, কিন্তু লিউসিস্টিক সাপের চোখ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও কালো রঙেরই থাকে, যা এই সাপটিকে আরও বেশি রহস্যময় করে তোলে।
উল্লেখ্য, কালাচ ভারতের অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং প্রধান চারটি বিষধর সাপ তথা ‘বিগ ফোর’ (Big Four)-এর অন্যতম একটি প্রজাতি। এর বিষ সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে, অর্থাৎ এটি অত্যন্ত শক্তিশালী নিউরোটক্সিক বিষ বহন করে। সামান্য কামড়ও মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বর্ষার এই মরশুমে মাটির বাড়ি, গোয়ালঘর কিংবা স্যাঁতসেঁতে ও অন্ধকার জায়গায় এই ধরণের বিষধর সাপের উপদ্রব বহুগুণ বেড়ে যায়।
সাপটি সফলভাবে উদ্ধারের পর বন্যপ্রাণী ট্রাস্টের সদস্যরা আতঙ্কিত গ্রামবাসীদের শান্ত করেন এবং এই পরিস্থিতিতে কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দেন। ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা, রাতে চলাফেরার সময় টর্চ ব্যবহার করা এবং জুতো পরে হাঁটার মতো প্রাথমিক সুরক্ষার পাঠ দেন তাঁরা। নিরাপদ স্থানে সাপটিকে ছেড়ে দেওয়ার পর গ্রামবাসীরা কিছুটা স্বস্তি পান।