ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে ‘বাংলাদেশি’ তকমা! ছত্তিশগড়ে মুর্শিদাবাদের ২৩ পরিযায়ী শ্রমিক আটকের ঘটনায় তোলপাড়!

সংসারের অভাব অনটন দূর করতে মাস দুয়েক আগে পেটের টানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছিলেন বাংলার বেশ কিছু মানুষ। মাথায় ছিল একটাই লক্ষ্য, কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে দু’মুঠো খাবার তুলে দেবেন। কিন্তু কেই বা জানত, ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে এই সাধের স্বপ্নই দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে! ছত্তিশগড়ের বিলাসপুরে বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর মহকুমার ২৩ জন গরিব পরিযায়ী শ্রমিককে পুলিশ কর্তৃক আটকের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। পরিবারের আকুল দাবি, বর্তমানে তাঁদের রায়পুরের একটি ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে। এই মর্মান্তিক খবর ঘরে পৌঁছতেই গোটা এলাকায় চরম উৎকণ্ঠা ও কান্নার রোল পড়েছে।

পরিবার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গিয়েছে, আটক হওয়া এই শ্রমিকদের অধিকাংশেরই বাড়ি মুর্শিদাবাদের সুতি ও সামশেরগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন গ্রামে। তাঁদের মধ্যে সামশেরগঞ্জের ধানঘরা এলাকার মোস্তাকিম শেখ, সাবির শেখ, সফিকুল ইসলাম, নাসিরুদ্দিন শেখ এবং সুতির হাড়োয়ার লাল্টু শেখসহ মোট ২৩ জন রয়েছেন। পেটের দায়ে প্রায় দু’মাস আগে তাঁরা ছত্তিশগড়ের বিলাসপুরে পাড়ি দিয়েছিলেন। সেখানে মূলত হাঁড়ি, বাসনপত্র এবং বিভিন্ন ঘরোয়া সামগ্রী ফেরি করে বিক্রি করতেন তাঁরা। সেই সামান্য উপার্জনেই কোনো রকমে দিন গুজরান হত তাঁদের পরিবারগুলির।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় আচমকাই বিলাসপুরের স্থানীয় থানার পুলিশ ওই পরিযায়ী শ্রমিকদের থানায় ডেকে পাঠায়। সরল মনে তাঁরা থানায় গেলে তাঁদের জোর করে আটকে রাখা হয়। এরপর গত রবিবার তাঁদের বিলাসপুরের জেলা আদালতে পেশ করা হয়েছে বলেও পরিবারের তরফে দাবি করা হয়েছে। এই গোটা ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের নাগরিকত্বের বৈধ নথি নিয়ে। আটক এক শ্রমিকের বাবা গিয়াসুদ্দিন মোল্লার জোরালো দাবি, তাঁদের প্রত্যেকের কাছেই ভারতীয় নাগরিকত্বের সমস্ত বৈধ নথি যেমন আধার কার্ড, ভোটার কার্ড বর্তমান। এমনকি ছত্তিশগড়ে পৌঁছনোর পরই তাঁরা নিয়ম মেনে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্থানীয় থানায় জমা দিয়ে তবেই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তাহলে এত কিছু সত্যেও কীভাবে তাঁদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হলো, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দানা বেঁধেছে।

এই আকস্মিক ঘটনায় জঙ্গিপুরের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। একদিকে দূর রাজ্যে প্রিয়জনকে আটকে রাখার দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অনুপস্থিতি পরিবারগুলোকে অথৈ জলে ফেলে দিয়েছে। আটক শ্রমিকদের পরিবারের আক্ষেপ, তাঁরা এ দেশেরই পাকা নাগরিক। কিন্তু ‘পুশব্যাক’ বা জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় এখন ঘুম উড়েছে স্বজনদের। যদিও ছত্তিশগড় পুলিশের তরফ থেকে ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ দিকে রাজ্য প্রশাসনের এক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা জানিয়েছেন, আটক শ্রমিকদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি যাচাই করার পাশাপাশি ছত্তিশগড় পুলিশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দ্রুত পরিবারের মানুষগুলোকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার দাবিতে এখন প্রশাসনের দিকেই চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রয়েছে জঙ্গিপুরের ২৩টি পরিবার।