মাঠে পাকিস্তানকে সপাটে ধবলধোলাই ভারতের! কিন্তু তার মাঝেই নারী ক্রিকেটারের লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে উঠল মারাত্মক বিতর্ক!

ভারত-পাকিস্তান মহিলা ক্রিকেট ম্যাচের উত্তাপের মাঝে ভারতীয় ক্রিকেটার ক্রান্তি গৌড়কে উদ্দেশ করে দর্শকদের একাংশের কিছু অত্যন্ত নোংরা ও আপত্তিকর মন্তব্য ঘিরে বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হাইভোল্টেজ ম্যাচ চলাকালীন গ্যালারি থেকে তোলা একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই গোটা দেশের ক্রিকেটপ্রেমী মহলে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটিতে দেখা ও শোনা গেছে যে, দর্শকদের মধ্য থেকে কয়েকজন ব্যক্তি ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটার ক্রান্তি গৌড়ের শারীরিক গঠন ও লিঙ্গ পরিচয়কে কেন্দ্র করে অত্যন্ত অসম্মানজনক ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছেন। এমনকি তাঁকে বারবার পুরুষ বলে দাবি করে কটূক্ষিপাত করা হয়েছে। যদিও সংবাদমাধ্যম বা সংশ্লিষ্ট সূত্রের পক্ষে ভিডিওটিতে উপস্থিত ওই সমস্ত দর্শকদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় এবং আকস্মিক এই ঘটনাটির পেছনের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবুও এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ আচরণ যে সুস্থ ক্রীড়া সংস্কৃতির পরিপন্থী, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।

মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে ভারত এবং পাকিস্তানের লড়াই বরাবরই অন্যতম রোমাঞ্চকর ও আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কিন্তু সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চেই একজন দেশের হয়ে খেলা মহিলা ক্রীড়াবিদকে লক্ষ্য করে এমন লিঙ্গবিদ্বেষী ও অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগ ওঠায় সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। নেটিজেনদের পাশাপাশি বহু বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ ও সচেতন নাগরিক এই ধরনের আচরণকে খেলাধুলার পবিত্র পরিবেশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং মহিলা ক্রীড়াবিদদের প্রতি চরম অসম্মানজনক বলে তীব্র ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন।

মাঠের বাইরের এই অনভিপ্রেত বিতর্কের বাইরেও গত শনিবার অনুষ্ঠিত মহিলা এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টির হাইভোল্টেজ ম্যাচে ভারতীয় দল সম্পূর্ণ আধিপত্য বজায় রেখে দুর্দান্ত জয় তুলে নেয়। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তান মহিলা ক্রিকেট দল ভারতীয় বোলারদের সামনে পুরোপুরি খাবি খায় এবং মাত্র ৫৫ রানে অলআউট হয়ে যায়। লক্ষণীয়ভাবে, এটিই টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে পাকিস্তান মহিলা দলের বিরুদ্ধে সর্বনিম্ন স্কোর হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে।

ভারতীয় বোলিং লাইনআপের সামনে পাক ব্যাটাররা দাঁড়াতেই পারেননি। ভারতীয় দলের স্পিনার শ্রী চরণী এবং প্রেমা রাওয়াত পাকিস্তানের ব্যাটিং অর্ডারে বিরাট ধস নামান। এই দুই প্রতিভাবান বোলার অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে প্রত্যেকে তিনটি করে মূল্যবান উইকেট তুলে নেন। শ্রী চরণী তাঁর কোটার চার ওভারে মাত্র ৭ রান খরচ করে ৩টি উইকেট দখল করেন, অন্যদিকে প্রেমা রাওয়াত মাত্র ৯ রান দিয়ে ৩টি উইকেট শিকার করেন। এছাড়া অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার দীপ্তি শর্মা দুটি এবং তারকা ব্যাটার শেফালি ভার্মার ঝুলিতেও যায় একটি উইকেট।

ম্যাচের শুরুতে অবশ্য পাকিস্তান দলের ব্যাটিং বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছিল এবং স্কোরবোর্ডে বিনা উইকেটে ২৭ রান তুলে তারা স্থিতিশীল সূচনা করেছিল। কিন্তু ভারতীয় স্পিনাররা আক্রমণে আসতেই সম্পূর্ণ বদলে যায় খেলার চিত্র। মাত্র ৯ রানের ব্যবধানে একের পর এক উইকেট হারিয়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং অর্ডার হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে এবং চোখের পলকে স্কোর ২৭/০ থেকে সোজা ৩৬/৬ উইকেটে গিয়ে দাঁড়ায়। ভারতের নিপুণ বোলিং আক্রমণের মুখে পড়ে পাক ব্যাটাররা ইনিংস জুড়ে মোট ৭৮টি ডট বল খেলতে বাধ্য হন, যা তাঁদের চরম ব্যাটিং ব্যর্থতার প্রমাণ দেয়।

জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য ৫৬ রানের লক্ষ্যমাত্রা তাড়া করতে নেমে ভারতীয় দল মাত্র ৮.৪ ওভারে তিন উইকেটের বিনিময়ে সহজেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। দলের হয়ে দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর ১৮ রানে অপরাজিত থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত ছক্কা মেরে অত্যন্ত স্টাইলে ম্যাচটি ফিনিশ করেন। তাঁর সঙ্গে দীপ্তি শর্মাও ১২ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন।

এই সুমহান ও দাপুটে জয়ের ফলে মহিলা টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপের মঞ্চে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় দলের সর্বগ্রাসী আধিপত্য আরও বেশি জোরালো হলো। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতায় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের মোট আটটি সাক্ষাতের মধ্যে এটি ভারতের সপ্তম দাপুটে জয়।

মাঠে টিম ইন্ডিয়ার এই চোখ ধাঁধানো ও দাপুটে জয়ের পাশাপাশি ক্রান্তি গৌড়কে ঘিরে তৈরি হওয়া এই অনভিপ্রেত বিতর্ক আবারও মহিলা ক্রীড়াবিদদের উদ্দেশে লিঙ্গবিদ্বেষী মন্তব্য ও শারীরিক অবয়ব নিয়ে কটূক্তির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে তীব্রভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম হোক কিংবা গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকদের গণ্ডি—মহিলা খেলোয়াড়দের সুরক্ষা ও সম্মান নিশ্চিত করতে এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ আচরণ চিরতরে বন্ধ করার জোরালো দাবি তুলেছেন সচেতন ক্রিকেটপ্রেমীরা।