বেআইনি নির্মাণ ও জমা জলই কেড়েছে প্রাণ! দিল্লির ধসে পড়া বাড়ি নিয়ে বড় নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর!

দিল্লির সত্য নিকেতনে বহুতল ধসের ভয়াবহ ঘটনার পর এবার আসরে নেমে কড়া পদক্ষেপ করল প্রশাসন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত বাড়ির মালিক হরিরামকে পাকড়াও করতে গত কাল সন্ধ্যা থেকে নাগাড়ে একাধিক জায়গায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে দিল্লি পুলিশ। সোমবারও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে উদ্ধারকাজ। এদিকে, সরাসরি ঘটনাস্থলে পৌঁছে নজিরবিহীন ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ‘বিপজ্জনক ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলি’ ভেঙে ফেলা নিয়ে একবারে কড়া বার্তা দিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা।

সোমবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, ‘‘রাজ্যের কোথাও কোনও বিপজ্জনক বা অবৈধ বাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেওয়া হবে না।’’ একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা কলকাতার বা দিল্লির অন্যান্য অঞ্চলগুলির ভবনগুলিরও বাধ্যতামূলকভাবে স্ট্রাকচারাল অডিট করা হবে এবং অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি স্পষ্ট করে দেন। এই ধরনের সমস্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে কী কী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে একটি বিস্তারিত খসড়া বা ব্লু-প্রিন্ট তৈরির জন্য প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে সরকার, এমনটাই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, যেখানেই নিম্নমানের নির্মাণকাজ করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হবে, সেই সমস্ত ভবনও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হবে। নিয়মের তোয়াক্কা না করে যারা সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করেছে, সেই দোষী কাউকেই একবিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না বলে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। সত্য নিকেতনের ধসের ঘটনায় এর মধ্যেই প্রায় ৮০ শতাংশ ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানালেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। শুধুমাত্র বেসমেন্টের সমপরিমাণ ধ্বংসাবশেষই এখন সরাতে বাকি রয়েছে। প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে ওই বেসমেন্টে প্রচুর পরিমাণে জল জমে ছিল। বেসমেন্টে জল জমে থাকার পাশাপাশি পুরনো ভবনটিতে চলা অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ মেরামতির কাজের জেরেই হুড়মুড়িয়ে বাড়িটি ধসে পড়েছে। এখনও পর্যন্ত মোট বারো জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।’’

উল্লেখ্য, দিল্লির সত্য নিকেতনে এই মর্মান্তিক বাড়ি ধসের ঘটনার পরেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। অবিলম্বে সংলগ্ন আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলার জন্য কঠোর নির্দেশ জারি করেছে দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন বা এমসিডি। নির্দিষ্ট ওই তেরো নম্বর সম্পত্তিটিকে অত্যন্ত “জীর্ণ, দুর্বল এবং বিপজ্জনক অবস্থায়” রয়েছে বলে উল্লেখ করে এমসিডি জানিয়েছে যে, ভবনটি সেখানে বসবাসকারী নিরীহ মানুষ এবং আশেপাশের পথচারীদের জন্য চরম নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করছে।

দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যাক্ট, ১৯৫৭-এর তিনশো আটচল্লিশ নম্বর ধারা এবং চারশো একানব্বই নম্বর ধারার অধীনে দক্ষিণ জোনের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার রবিবারই এই ভাঙার নির্দেশিকা জারি করেছেন। নির্দেশনামা হাতে পাওয়ার মাত্র তিন দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক বা দখলদারকে নিজে দায়িত্ব নিয়ে ভবনটি ভেঙে ফেলতে বলা হয়েছে।

নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে যদি নির্দেশ পালন না করা হয়, তবে পৌরনিগম বা এমসিডি নিজে থেকেই পুলিশি সুরক্ষায় ভবনটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে বলে কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ওই বাড়ি ভাঙার সমস্ত খরচ সম্পত্তির মালিকের কাছ থেকে বকেয়া মিউনিসিপ্যাল কর হিসেবে কড়া হাতে আদায় করা হবে।

সত্য নিকেতনে একটি বেআইনি বাড়ি ধসে মর্মান্তিকভাবে ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরই প্রশাসন এমন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ঘটনার জেরে ধসে পড়া বাড়িটির সংলগ্ন অন্যান্য ভবনগুলির নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকা কাঠামোগুলির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়েছে।

এমসিডি-র তরফে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যে ভবনটি নতুন করে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ পুরনো এবং সনাতন নির্মাণ পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছিল। ওই ভবনে কাঠামোগত সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো সাপোর্টিং পিলার বা স্তম্ভ নেই বলেই জানা গিয়েছে। তার পরিবর্তে দুর্বল ইটের দেওয়ালগুলি সরাসরি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে কোনোমতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। ফলে সামান্য আঘাতেই ভবনটি মারাত্মকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।