তৃণমূল সাংসদের বাড়িতে ইডির ম্যারাথন তল্লাশি! কোটি কোটি টাকার বেনামি লেনদেনের অভিযোগে তোলপাড়

কলকাতা, রাঁচী এবং নয়াদিল্লি—এই তিন প্রধান শহরের মোট ৭টি ভিন্ন ঠিকানায় একযোগে ম্যারাথন তল্লাশি অভিযান চালাল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। সোমবার সকাল ৭টা নাগাদ শুরু হওয়া এই আকস্মিক অভিযানে সরাসরি নজরদারির কেন্দ্রে রয়েছেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ নাদিমুল হক। কেন্দ্রীয় সংস্থার এই সাঁড়াশি অভিযানে তাঁর বসতবাটি, নিজস্ব ফ্ল্যাট এবং একটি বিশেষ সংবাদপত্রের কার্যালয় রয়েছে। হঠাৎ কেন এই তল্লাশি এবং কীসের ভিত্তিতে এই অভিযান, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

ইডির তদন্তকারীদের প্রাথমিক নজর পড়েছে পার্ক সার্কাসের ৪ নম্বর ব্রিজের কাছে দরগা রোড এলাকায়। এই ঠিকানাতেই অবস্থিত পরিচিত উর্দু সংবাদপত্র ‘আখবার-এ-মাশরিক’-এর মূল কার্যালয় এবং সাংসদের বসতবাটি। এই সংবাদপত্রের ডিরেক্টর পদে আসীন রয়েছেন স্বয়ং তৃণমূল সাংসদ নাদিমুল হক। মূল কার্যালয়ের অত্যন্ত কাছাকাছি পার্ক সার্কাসের পি২৫৮ নম্বর ঠিকানায় সাংসদের মেয়ের আরেকটি আবাসিক হাসপাতালেও তল্লাশি চালানো হয়। তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে, এই অভিজাত বাড়িতেই বর্তমানে বসবাস করেন সাংসদ। মূলত তাঁর মেয়ে ও জামাই এই উর্দু সংবাদপত্রটি পরিচালনা করে থাকেন।

কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই বিপুল তল্লাশি অভিযানের মূল ভিত্তি হল আর্থিক তছরুপ ও বেনামি লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ। ২০২৬ সালে ‘আখবার-এ-মাশরিক’ সংবাদ সংস্থার আর্থিক গতিবিধি নিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছিল কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে। সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এবং মানি লন্ডারিংয়ের প্রমাণ খুঁজতে ইডি এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে এফআইআর বা ইসিআইআর দায়ের করে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই সংবাদ সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বিপুল আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকার উৎস কী এবং কোন পথে তা ঘুরিয়ে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।

তদন্তে নেমে ইডি আধিকারিকরা একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্যের হদিশ পেয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। প্রাথমিক সূত্রের দাবি, তল্লাশির সময়ে বেশ কিছু বেনামী ও ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে। পাশাপাশি, একাধিক সন্দেহজনক ও জালিয়াতিপূর্ণ ডিপোজিটের নথিপত্রও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। এই সমস্ত ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও ফলস ডিপোজিটের মাধ্যমে ঘুরপথে বেআইনিভাবে কোটি কোটি টাকা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এই বেআইনি লেনদেনের নিখুঁত জাল কীভাবে বোনা হয়েছিল, তা উন্মোচন করতেই বর্তমানে সাংসদের মেয়ে এবং জামাইকে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সংবাদপত্রের আর্থিক পরিচালন ব্যবস্থা ও কর ফাঁকি বা জালিয়াতির কোনো যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

একযোগে কলকাতা, দিল্লি ও রাঁচীর বিভিন্ন ঠিকানায় এই তল্লাশি চলায় রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যখন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক দলের বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছে বিরোধী শিবির, অন্যদিকে আইন তার নিজস্ব গতিতে কাজ করছে বলেই দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের। তদন্ত যত এগোবে, এই বিপুল আর্থিক কেলেঙ্কারির নেপথ্যে থাকা চাঞ্চল্যকর তথ্য ততটাই স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে।