সেবক রোড থেকে শিবমন্দির—শিলিগুড়িতে হুড়মুড়িয়ে সিল হল একাধিক রেস্তোরাঁ! বড়সড় ধামাচাপা দেওয়া কাণ্ড ফাঁস!

রাজ্যজুড়ে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের সাঁড়াশি অভিযানের মাঝেই এবার শিলিগুড়ির একাধিক জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ও বারে হানা দিয়ে উঠে এল এক ভয়ংকর ও চাঞ্চল্যকর চিত্র। রেস্তোরাঁর বন্ধ রান্নাঘরের অন্দরে রমরমিয়ে চলছে পচা-বাসি মাংস, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার এবং হরেক রকমের ক্ষতিকর রাসায়নিকের কারবার। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে চলা এই রকমারি ছিনিমিনি খেলার খবর সামনে আসতেই শহরজুড়ে চরম শোরগোল ও তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।

শুক্রবার শিলিগুড়ির ব্যস্ততম সেবক রোডের একটি নামী বার কাম রেস্টুরেন্টে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এক যৌথ অভিযান চালায় প্রশাসন। জলপাইগুড়ির মহকুমা শাসক মইম আহমেদের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে খাদ্য সুরক্ষা দফতর, এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ (ইবি) এবং স্থানীয় থানার পুলিশ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। রেস্তোরাঁটির কিচেনে পা রাখতেই আধিকারিকরা হতবাক হয়ে যান। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে একের পর এক মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রী উদ্ধার করা হয়। খাবারের গুণমান এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে কালবিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে ওই রেস্তোরাঁর রান্নাঘর সিল করে দেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে জনস্বার্থবিরোধী এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ করা হচ্ছে। এর আগে মালদহ জেলাতেও ঠিক এই একই কায়দায় বড়সড় অভিযান চালিয়েছিল প্রশাসন।

তবে শুধু সেবক রোডেই নয়, শিলিগুড়ির মাটিগাড়ার শিবমন্দির এলাকার অপর একটি নামী রেস্তোরাঁতেও হানা দেয় খাদ্য সুরক্ষা দফতর, ইবি এবং পুলিশের একটি যৌথ দল। সেখানে গিয়ে রান্নাঘর ও খাদ্যভাণ্ডার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতেই বেরিয়ে আসে আসল রহস্য। অভিযোগ ওঠে, রেস্তোরাঁর ফ্রিজে অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক উপায়ে বাসি মাংস জমিয়ে রাখা হয়েছিল। প্লাস্টিকের কন্টেনারে রাখা সেই মাংস পরীক্ষা করে তদন্তকারী দলের স্পষ্ট সন্দেহ হয় যে সেগুলি কেবল একদিনের পুরনো নয়, বরং দীর্ঘদিনের বাসি। শুধু তাই নয়, ওই একই রেস্তোরাঁ থেকে প্রচুর পরিমাণে মেয়াদোত্তীর্ণ লস্যিও উদ্ধার করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের পেটে গেলে বড়সড় শারীরিক বিপর্যয় ঘটতে পারত।

তদন্তের স্বার্থে ঘটনাস্থল থেকেই মাংস এবং অন্যান্য খাবারের সুনির্দিষ্ট নমুনা সংগ্রহ করেছে বিশেষজ্ঞ দল। রেস্তোরাঁ মালিককে আগামী সাত দিনের কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট এই সময়ের মধ্যে সমস্ত ত্রুটি সংশোধন করার পাশাপাশি বাজেয়াপ্ত হওয়া খাদ্যসামগ্রী সম্পর্কে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে হবে। মাটিগাড়ার বিডিও প্রীতম দাস শর্মা জানিয়েছেন যে, নির্ধারিত সাত দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর ফের ওই রেস্তোরাঁয় আচমকা অভিযান চালিয়ে খতিয়ে দেখা হবে তারা নির্দেশিকা মেনেছে কি না।

অন্যদিকে, শুধু হোটেল বা রেস্তোরাঁই নয়, খাবারে বিষাক্ত রং ও রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধেও রাজ্যজুড়ে সমানতালে জোরদার অভিযান চালাচ্ছে খাদ্য সুরক্ষা দফতর। কাকদ্বীপ মহকুমার নামখানা ও জুমাইনস্করহাট এলাকার বিভিন্ন মিষ্টির দোকান, ফলের বাজার এবং ফাস্টফুডের স্টলে হানা দিয়ে খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত একাধিক বিপজ্জনক ক্ষতিকারক রাসায়নিক ও নিষিদ্ধ রং উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানের সময় হাতেনাতে উদ্ধার হওয়া এই সমস্ত বিষাক্ত রাসায়নিক তাৎক্ষণিকভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে আইনগত নিয়ম মেনে জনসমক্ষে সেগুলিকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেওয়া হয়। এলাকার সমস্ত ব্যবসায়ীকে কঠোরভাবে সতর্ক করে জানানো হয়েছে যে, আগামী দিনে জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে খাবারে শুধুমাত্র অনুমোদিত ও নিরাপদ উপাদানই ব্যবহার করতে হবে। যারা এই সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি করা হয়েছে। খাদ্য সুরক্ষা দফতরের তরফ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস রোধ করতে এই ধরনের আকস্মিক ও কঠোর অভিযান আগামী দিনেও অবিরাম চালিয়ে যাওয়া হবে।