পুজোর আগেই বড় ধাক্কা! পূর্ব মেদিনীপুরের বাইক শোরুমগুলিতে আচমকা হানা দিল পরিবহন দফতর!

উৎসবের মরশুম তথা পুজোর বাজার শুরু হওয়ার ঠিক আগেই রাজ্যের সাধারণ ক্রেতাদের সুরক্ষা এবং আইনি নিয়মকানুন কঠোরভাবে বজায় রাখতে এবার সরাসরি ময়দানে নেমে পড়ল পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিবহন দফতর। পুজোর আগে মূলত মোটরসাইকেলের বিক্রি ব্যাপক পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, আর সেই কথা মাথায় রেখেই জেলার বিভিন্ন বাইকের শোরুমগুলিতে কড়া নজরদারি ও আচমকা পরিদর্শনের বিশেষ অভিযান শুরু করেছে প্রশাসন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার থেকে শুরু করে হোটেল ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে যেমন নিয়মিত অভিযান চলছে, ঠিক তেমনই এবার পরিবহন দফতরের শীর্ষ আধিকারিকদের মূল নজরে চলে এসেছে জেলার বিভিন্ন মোটরসাইকেলের শোরুমগুলি।

এই বিশেষ অভিযانের অংশ হিসেবে সম্প্রতি তমলুক শহরের মানিকতলা এলাকার একাধিক নামী-দামি বাইকের শোরুমে একেবারে আকস্মিক হানা দেন আধিকারিকরা। জেলা আঞ্চলিক পরিবহন আধিকারিক (RTO) সঞ্জয় হালদার এবং এআরটিও-সহ পরিবহন দফতরের পদস্থ কর্তারা দলবল নিয়ে ওই শোরুমগুলিতে সরাসরি প্রবেশ করেন এবং বিক্রির সমস্ত নথিপত্র, স্টক রেজিস্টার ও গাড়ি হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখেন। মূলত আসন্ন দুর্গাপূজার ঠিক আগে উৎসবের বাজারের ভিড়ে বাইক বিক্রির সময় কোনো ধরনের বেআইনি কারবার বা সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতেই পরিবহন দফতরের এই আকস্মিক ও জোরদার অভিযান বলে দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে।

পরিবহন দফতর সূত্রে আরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে জানানো হয়েছে যে, এর আগে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বেশ কয়েকটি বাইকের শোরুমের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ জমা পড়েছিল। অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল—কোথাও কোথাও আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একেবারে বৈধ নম্বর প্লেট ছাড়াই মোটরসাইকেল বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আইন অমান্য করে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স বা উপযুক্ত কাগজপত্র না থাকা সত্ত্বেও বহু ক্রেতার কাছে গাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগও প্রশাসনের নজরে এসেছে। সাধারণ মানুষের জীবনহানির ঝুঁকি এড়াতে এই ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডকে একেবারেই বরদাস্ত করতে নারাজ জেলা প্রশাসন।

বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন এবং বিগত দিনে জেলার সমস্ত বাইক শোরুমের মালিকদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছিল পরিবহন দফতর। সরকারের বেধে দেওয়া সমস্ত আইনগত নিয়ম ও নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে তবেই গাড়ি বিক্রি করার জন্য তাঁদের প্রতি স্পষ্ট নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শোরুমের মালিকপক্ষের তরফ থেকেও সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে সরকারি নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মোটরসাইকেল বিক্রির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। আর সেই সমস্ত নির্দেশ ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা সঠিকভাবে কার্যকর করা হচ্ছে, তা হাতে-কলমে যাচাই করতেই এ দিনের এই আচমকা কড়া অভিযান চালানো হয়।

এ দিন তমলুকের মানিকতলা এলাকার শোরুমগুলিতে পরিদর্শনের সময় আধিকারিকরা সরাসরি বিক্রির সমস্ত নথি, ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় আইনি কাগজপত্র এবং মোটরসাইকেল ডেলিভারির প্রক্রিয়া সরেজমিনে তদন্ত করেন। গাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতিটি সরকারি নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে মানা হচ্ছে কি না, সেটাই ছিল এই পুরো পরিদর্শনের মূল ফোকাস। অভিযান শেষে জেলা আরটিও সঞ্জয় হালদার সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, “আমরা আগেই সমস্ত শোরুমের মালিকদের সরকারি নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য সতর্ক করে দিয়েছিলাম। আজ সেই নির্দেশ বাস্তবে রূপায়িত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতেই আমরা পরিদর্শনে এসেছিলাম।”

তবে সাময়িক স্বস্তির খবর হলো, এ দিনের আকস্মিক পরিদর্শনে জেলার যে তিনটি প্রধান শোরুম খতিয়ে দেখা হয়েছে, সেখানে আপাতত সমস্ত সরকারি নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে বলেই জানা গেছে। অর্থাৎ, আজকের এই অভিযানে কোনো বড় ধরনের বেআইনি অনিয়মের সরাসরি প্রমাণ মেলেনি বলেই দফতর সূত্রে স্বস্তির খবর মিলেছে। তা সত্ত্বেও পরিবহণ দফতরের এই কড়া নজরদারি এখানেই শেষ হচ্ছে না। বিশ্বস্ত সূত্রে খবর, আসন্ন পুজোর বাজার ও উৎসবের দিনগুলিতে মোটরসাইকেল বিক্রির পরিমাণ তুঙ্গে থাকার সম্ভাবনা থাকায়, আগামী দিনেও পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন প্রান্তের বাইকের শোরুমগুলিতে এ ধরনের গোপন ও আচমকা অভিযান অব্যাহত থাকবে।

জেলা আরটিও স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, আগামী দিনেও এই ধরনের রুটিন ও সারপ্রাইজ ভিজিট কঠোরভাবে জারি থাকবে। পরিদর্শনের সময় ভবিষ্যতে যদি কোনো শোরুমে ন্যূনতম কোনো অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ধরা পড়ে, তবে সংশ্লিষ্ট শোরুমের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ফলস্বরূপ, পুজোর আগে বাইক বিক্রির এই বাড়তি বাণিজ্যিক ব্যস্ততার মরশুমেও যে কোনোভাবেই আইন ভঙ্গকারীদের সামান্যতম ছাড় দেওয়া হবে না, তা একেবারে পরিষ্কার করে দিল পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিবহন দফতর।