কর বাঁচাতেই কি টাটাদের শেয়ার বিক্রি হয়েছিল? চ্যারিটি কমিশনারের রায়ে পরিষ্কার হয়ে গেল সব জল্পনা!

মহারাষ্ট্র চ্যারিটি কমিশনার ১৯৮৯ সালের একটি অত্যন্ত পুরোনো ও আলোচিত মামলায় বড় স্বস্তির রায় ঘোষণা করে নওয়াজবাই রতন টাটা ট্রাস্ট (NRTT) থেকে নাভাল এইচ. টাটার কাছে টাটা সন্সের ৮৩৩টি শেয়ার হস্তান্তরের তদন্ত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে তদন্তে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, সেসময়ে শেয়ার হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে তৎকালীন প্রযোজ্য আইন এবং নিয়মকানুন মেনেই সম্পন্ন হয়েছিল। এর ফলে বিগত বেশ কিছুদিন ধরে এই প্রাচীন চুক্তিকে ঘিরে তৈরি হওয়া জল্পনা এবং বিতর্কের একটি বড় অংশের স্থায়ী সমাধান হয়ে গেল, যা শিল্পমহলে দারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
গত কয়েক মাস ধরে টাটা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে চলা নানা বিবাদের মাঝেই ১৯৮৯ সালের এই পুরোনো শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়টি হঠাৎ করেই সামনে চলে আসে। সেসময়ে অভিযোগকারীদের একাংশ জোরালোভাবে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ওই বিশেষ শেয়ারগুলো থেকে চূড়ান্তভাবে সুবিধাভোগী হয়েছেন নোয়েল টাটা, আর সেই কারণেই এই গোটা বিষয়টিতে বড় ধরনের স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) বা আইনি জটিলতা থাকতে পারে। তবে যাবতীয় অভিযোগ ও যুক্তির অবসান ঘটিয়ে মহারাষ্ট্রের রাজ্য দাতব্য কমিশনার অমোগ এস. কালোটি তাঁর গত ২ সেপ্টেম্বরের সুনির্দিষ্ট আদেশে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তখনকার সেই শেয়ার বিক্রি বা হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ন্যায্য ও স্বচ্ছ ছিল। ট্রাস্টের কাছে প্রয়োজনীয় সমস্ত আইনি নথি মজুত ছিল এবং যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই তৎকালীন বাজারমূল্য অনুযায়ী শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তদন্তে খতিয়ে দেখা হয়েছে যে, মূলত কী পরিস্থিতির মুখে পড়ে এই শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এনআরটিটি-র কাছে টাটা সন্সের একটি বড় অংশের শেয়ার ছিল এবং ১৯৮৪ সাল থেকে ট্রাস্টের কর্তাব্যক্তিরা এই শেয়ারগুলো বিক্রির কথা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছিলেন। এর পেছনে মূল অনুঘটক ছিল কর বিধিমালায় আসা বড় ধরনের পরিবর্তন। আয়কর আইনে নানা পরিবর্তনের ফলে নির্দিষ্ট বিভাগের আওতাধীন না থাকা কিছু বিনিয়োগ ধারণকারী দাতব্য ট্রাস্টগুলোর ক্ষেত্রে বড় রকমের কর ছাড় হারানোর প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এমনকি ১৯৮৮ সালের নভেম্বর মাসে সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ডাইরেক্ট ট্যাক্সেস (CBDT) পক্ষ থেকে এনআরটিটি-কে একটি জাতীয় ট্রাস্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও সোজাসাপ্টা অস্বীকার করা হয়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে ট্রাস্টটির ওপর বিশাল পরিমাণ করের বোঝা চেপে বসার আশঙ্কা দেখা দেয়।
প্রাপ্ত তথ্য ও চ্যারিটি কমিশনারের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৯৮৬-৮৭ এবং ১৯৮৮-৮৯ অর্থবর্ষের মধ্যে ট্রাস্টটির প্রায় ৪.২৩ লক্ষ টাকার সম্ভাব্য বিশাল করের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। এই অতিরিক্ত করের আর্থিক চাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে এবং ট্রাস্টের অমূল্য সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে শেষ পর্যন্ত ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ তাদের টাটা সন্সের শেয়ারগুলো বিক্রি করে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় নাভাল টাটার ভূমিকা ঠিক কী ছিল, তাও পরিষ্কার করা হয়েছে। নাভাল টাটা অতীতে এনআরটিটি-র একজন সম্মানিত ট্রাস্টি ছিলেন, তবে তিনি ১৯৮৮ সালের ১ জানুয়ারি অত্যন্ত সচেতনভাবে ট্রাস্টি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর সেই পদত্যাগের বিষয়টি তখনই সংশ্লিষ্ট সমস্ত কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা যথাযথভাবে গৃহীতও হয়।
পরবর্তী সময়ে এই প্রস্তাবিত শেয়ার ক্রয় প্রক্রিয়াটি দেশের অন্যতম প্রখ্যাত ও দূরদর্শী আইনজ্ঞ নানি এ. পালখিভালা দ্বারা নিখুঁতভাবে আইনগতভাবে পরীক্ষা করানো হয়। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে তাঁর আইনি মতামতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, নাভাল টাটা যেহেতু আর ট্রাস্টের ট্রাস্টি পদে বহাল নেই, তাই তাঁর পক্ষে এই শেয়ারগুলো ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনি বাধার প্রাচীর নেই। তিনি জোরালোভাবে এও সুপারিশ করেছিলেন যে, তাঁর পদত্যাগের অন্তত এক বছর পর যেন এই শেয়ারগুলো বিক্রি করা হয় এবং একটি সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয় যাতে শেয়ারগুলো কোনোভাবেই টাটা পরিবারের নিজস্ব বৃত্তের বাইরে হস্তান্তর করা না হয়।
সমস্ত আইনি দিক খতিয়ে দেখার পর ৮৩৩টি শেয়ারের প্রতিটির দাম ১,৯১৪ টাকা করে নির্ধারিত হয়েছিল এবং নাভাল টাটা এই নির্দিষ্ট দামেই শেয়ারগুলো কিনতে সম্পূর্ণ সম্মত হন। এই ঐতিহাসিক ও সম্পূর্ণ চুক্তিটি ১৯৮৯ সালের ১৮ জানুয়ারি আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। সরকারি নথি ও হিসাব অনুযায়ী, সেই মোট লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫.৯৪ লক্ষ টাকা। এই সফল বিক্রির মাধ্যমে ট্রাস্টটি সেসময়ে প্রায় ৮.১৫ লক্ষ টাকা লাভও অর্জন করেছিল। চ্যারিটি কমিশনারও একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, এই শেয়ার হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত আইনি কাগজপত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল এবং টাটা সন্স বোর্ড অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে এই লেনদেনটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছিল।