বিচারব্যবস্থাতেই সুরক্ষিত নন মহিলা বিচারকরা! ইন্দিরা জয়সিংয়ের বিস্ফোরক অভিযোগে কাঁপছে আইনি মহল

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা ক্ষেত্রে নারীদের ওপর যৌন হেনস্থার ঘটনা মাঝেমধ্যেই প্রকাশ্যে আসে। কিন্তু যে বিচারব্যবস্থার ওপর ভরসা রেখে সাধারণ মানুষ ও মহিলারা ন্যায়ের আশায় আদালতের দরজায় কড়া নাড়েন, সেই বিচারব্যবস্থার অন্দরেই মহিলা বিচারকরা চরম असुरक्षित—এমন এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক দাবি করলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং। সম্প্রতি ২৯তম ডি এস বোরকর স্মারক বক্তৃতায় ‘My Vision of India: 2047 A.D’ শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন যে, যৌন হেনস্থা হলো ভারতীয় বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় এবং গোপন ‘ডার্টি সিক্রেট’। তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে গোটা দেশের আইনি ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র শোরগোল শুরু হয়েছে।
বক্তৃতা রাখতে গিয়ে ইন্দিরা জয়সিং তাঁর দীর্ঘ আইনি পেশার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানান যে, পুরুষ সহকর্মীদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার গুরুতর অভিযোগ নিয়ে একাধিক মহিলা বিচারক তাঁর শরণাপন্ন হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার কর্মজীবনে বহু মহিলা বিচারকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে এবং তাঁদের আইনি লড়াইয়ে পাশে দাঁড়িয়েছি। পুরুষ বিচারকদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার একাধিক অভিযোগ নিয়ে তাঁরা আমার কাছে এসেছিলেন। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই আমি আমার বইতে লিখেছিলাম যে, যৌন হেনস্থা হলো ভারতের বিচারব্যবস্থার ‘ডার্টি সিক্রেট’, যা নিয়ে কেউ জনসমক্ষে মুখ খুলতে চান না।”
একটি নির্দিষ্ট ঘটনার উদাহরণ দিয়ে ইন্দিরা জয়সিং জানান, তিনি যে মহিলা বিচারকের হয়ে মামলা লড়েছিলেন, তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে হাইকোর্টের কোনো বিচারপতি অবসর নিলে জেলা আদালতের মহিলা বিচারকদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। এমনকি তাঁদের একই রঙের শাড়ি পরতে বাধ্য করা হতো এবং পুরুষ বিচারকরা ডাইনিং রুমে প্রবেশ করার সময় তাঁদের ওপর ফুল ছড়ানোর মতো অবমাননাকর প্রথা পালন করতে বলা হতো। উচ্চতর বিচারব্যবস্থার এই সামন্ততান্ত্রিক প্রথার তীব্র নিন্দা করে তিনি বলেন যে, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিরা জেলা স্তরের বিচারকদের কাছ থেকে এই ধরনের দাসসুলভ আচরণ প্রত্যাশা করেন, যার পরিণতি মহিলা বিচারকদের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর আরও এক ভয়ংকর ঘটনার উল্লেখ করে জয়সিং বলেন, ওই একই নির্যাতিতা মহিলা বিচারক তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, এক শীর্ষ স্থানীয় বিচারক তাঁকে সরাসরি কুপ্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, “আমার ২৫তম বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এসে তোমাকে একটি আইটেম নম্বরে নাচতে হবে।” কিন্তু সেই অমানবিক ও অসম্মানজনক প্রস্তাব তিনি সোজাসাপ্টা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আর সেই প্রতিবাদ করার জন্যই তাঁকে চূড়ান্ত মূল্য হিসেবে চাকরি হারাতে হয়েছিল। তবে এতকিছুর পরেও ইন্দিরা জয়সিং আশা প্রকাশ করেন যে, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের বিচারব্যবস্থা থেকে এই ধরনের লজ্জাজনক ও সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার চিরতরে অবসান ঘটবে।
ওই একই অনুষ্ঠানে ইন্দিরা জয়সিংয়ের পাশাপাশি বক্তব্য রাখেন বর্ষীয়ান আইনজীবী ড. এস মুরলীধর। তিনিও বিচারব্যবস্থার কঠোর পদমর্যাদাভিত্তিক সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে জানান যে, সিনিয়র পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকে অবিরত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য এবং হয়রানির শিকার হয়ে বহু মহিলা বিচারক মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছেন। এই ধরনের ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তবে বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে এসে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক আশাবাদী বার্তা দেন ইন্দিরা জয়সিং। জেন-জি বা নতুন প্রজন্মের তরুণেরা যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন যে এত খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি ভবিষ্যতে ভাল কিছু হওয়ার আশা কোথায় পান, তখন জয়সিং দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে ভারতের সংবিধানই তাঁকে সেই অফুরন্ত লড়াইয়ের শক্তি ও আশা জোগায়।