‘দেহ মিললেও একজনের খোঁজ নেই!’ শাহজাহান বাহিনীর ওপর খাঁড়া ঝুলিয়ে সিবিআইয়ের মেগা অ্যারেস্ট

সাত বছর আগের এক লোমহর্ষক রাজনৈতিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হাইপ্রোফাইল তিন বিজেপি কর্মী খুনের মামলায় এবার অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ করল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং দফায় দফায় ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে তৃণমূল কংগ্রেসের ছ’জন সক্রিয় কর্মীকে একসঙ্গে গ্রেফতার করলেন গোয়েন্দারা। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত এই ছয় অভিযুক্তের নাম স্বপন দাস, বাবলু মোল্লা, জহর মীর, মোমিন মীর, স্বপন মণ্ডল এবং ভানুময় মণ্ডল। এই চাঞ্চল্যকর আটকের ফলে গোটা মামলার মোট গ্রেফতারের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়াল ১৬ জনে।

ঘটনার নেপথ্যের ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ২০১৬ সালের আট জুন লোকসভা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জামাইষষ্ঠীর পবিত্র দিনে সন্দেশখালির ন্যাজাটের ভাঙিপাড়ায় একটি দলীয় পতাকা টাঙানোকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ ওঠে, এলাকার তৎকালীন ত্রাস শেখ শাহজাহান ও কাদের মোল্লার অনুগামীরা সম্পূর্ণ সশস্ত্র হয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। এই ভয়াবহ সংঘর্ষের জেরে তিন বিজেপি কর্মী—প্রদীপ মণ্ডল, সুকান্ত মণ্ডল ও দেবদাস মণ্ডল নির্মমভাবে খুন হন। ঘটনার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে দুই জনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, তৃতীয় জনের দেহ আজও রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ রয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে রাজ্য পুলিশ ও সিআইডি-র ভূমিকা এবং তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে চরম অনাস্থা প্রকাশ করে নিহত বিজেপি কর্মীদের পরিবার। নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্তের দাবিতে শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তাঁরা। আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশেই পরবর্তীতে এই জটিল মামলার তদন্তভার নিজের কাঁধে তুলে নেয় সিবিআই। উল্লেখ্য, বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কড়া হুংকার দিয়ে বলেছিলেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায্য বিচার হবে এবং মূল অপরাধীরা কঠিন শাস্তি পাবে। রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া লাগতেই সিবিআই তৎপর হয়ে এর আগে ১০ জন অভিযুক্তকে জালে পুরেছিল। আর এবার নতুন করে আরও ৬ জনকে গ্রেফতার করার পর সন্দেশখালির রাজনীতিতে ফের একবার চরম উত্তেজনার পারদ চড়েছে।

এই মেগা গ্রেফতারির পর সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলেছেন নিহত পরিবারের অন্যতম সদস্য সন্দীপ মণ্ডল। তিনি ক্ষোভ ও আশার সুরে জানান, “২০১৯ সালের আট জুন (মূলত ২০১৬ সালের ঘটনার প্রেক্ষিতে) শাসকদলের হার্মাদ বাহিনী শেখ শাহজাহান ও কাদের মোল্লার সরাসরি নেতৃত্বে আমাদের পরিবারের তিনজন সদস্যকে নৃশংসভাবে খুন করেছিল। তখনকার সরকারি প্রশাসন ও পুলিশ পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিল। এরপর শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। আগের ধৃতদের পর এবার এই ছ’জনকে গ্রেফতার করায় আমরা কিছুটা আশাবাদী যে এবার হয়তো সঠিক বিচার পাব। তবে শুধু এই দুষ্কৃতীরাই নয়, যে সমস্ত পুলিশ অফিসার সেই সময় তদন্তের গতিপ্রকৃতি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে মূল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন এবং চার্জশিট থেকে নাম বাদ দিয়েছিলেন, সিবিআইয়ের উচিত তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেও কঠোরতম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।”

অন্যদিকে, এই পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করে বিশিষ্ট বিজেপি নেত্রী পিয়ালি দাস বলেন, “আমরা পুরোমাত্রায় আশাবাদী যে বর্তমান বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসন দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে।” প্রসঙ্গত, এই একই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে খোদ শেখ শাহজাহান-সহ একাধিক রাঘববোয়ালের নাম মূল মামলা থেকে সচেতনভাবে বাদ দেওয়ার ഗുരുতর অভিযোগ উঠেছিল। যদিও তৎকালীন সন্দেশখালির ত্রাস শাহজাহান বর্তমানে অন্য মামলায় আইনগতভাবে জেল হেফাজতেই দিন কাটাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় সূত্রে খবর, ধৃত এই ছয়জনকে খুব শীঘ্রই স্থানীয় আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার জোরালো আবেদন জানাবেন তদন্তকারীরা। সুদীর্ঘ সাত বছর পর সিবিআইয়ের এই ঝাঁঝালো ও அதிரডি পদক্ষেপে ভাঙিপাড়া এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে। এখন দেখার, দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার সেই কাঙ্ক্ষিত দিনে নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন কি না।