পুজোর চার দিন এখন অতীত! কবে থেকে শুরু হলো ৭-৮ দিনের মহোৎসব আর কীভাবে বদলে গেল বাঙালির সেরা উৎসব?

আজ থেকে কয়েক দশক আগের কথা। একটি প্রাচীন বাংলা পত্রিকায় ১৪০০ বঙ্গাব্দের দুর্গাপুজো নিয়ে সমাজের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই সময় অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, ১৪০০ সালের পর আদৌ কি বাংলায় দুর্গাপুজো টিকে থাকবে? আর থাকলেও তার রূপ ঠিক কেমন হবে? সময়ের চাকা ঘুরে আজ বাংলা এসে পৌঁছেছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে। আর ঠিক তার আগে থেকেই দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বর্তমানে বাঙালির প্রধান উৎসবের সময় খাওয়া-দাওয়া কী হবে, মণ্ডপের সজ্জা কেমন হওয়া উচিত কিংবা দেবীর প্রতিমার মুখের গড়ন কেমন হবে—এসব নানা বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে তুমুল আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক। বরাবরের মতো এবারও পুজোকে ঘিরে জোর কদমে শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক তরজমা। প্রত্যেকেই নিজ নিজ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও এজেন্ডা অনুযায়ী দুর্গাপুজোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।

১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কলকাতা সহ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোর বর্তমান রূপরূপ একেবারেই আলাদা ছিল। সেই যুগে থিমভিত্তিক মণ্ডপ বা প্রতিমার চল প্রায় ছিলই না বললেই চলে। পুজো বলতে মূলত ষষ্ঠী থেকে দশমী—এই পাঁচ দিনের সংক্ষিপ্ত পরিসরকেই বোঝাতো। অধিকাংশ মণ্ডপেই ষষ্ঠীর দিন দেবীর প্রতিমার হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হতো না, বরং সপ্তমীতে বোধনের পরই রীতি মেনে অস্ত্র দেওয়া হতো। কিন্তু ১৯৯৯-২০০০ সালের দিকে শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব প্রথা ভেঙে চতুর্থী, পঞ্চমী এমনকি তৃতীয়াতেই পুজোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য পুজো কমিটিগুলিও সেই ধারা অন্ধের মতো অনুসরণ করতে শুরু করে। ফলে চার দিনের চিরচেনা পুজো বদলে গিয়ে সাত থেকে আট দিন ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে প্যান্ডেল হপিং বা ঘোরাঘুরির নতুন সংস্কৃতি তৈরি হয়। ২০২২ সালে কসবার একটি পুজো মণ্ডপ সম্পূর্ণ ভাঁড় বা মাটির পাত্র দিয়ে তৈরি হয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। সেই অভিনব মণ্ডপ দেখতে এতটাই ভিড় জমেছিল যে প্রতিমা বিসর্জনের পরেও শুধু মণ্ডপ পরিদর্শনের জন্য মানুষের ঢল নামে এবং শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ বাধ্য হয়ে সেই মণ্ডপ ভেঙে দেয়। এরপর থেকেই মূলত রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন পুজোয় থিমের রমরমা শুরু হয়।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, বাম আমল থেকেই পুজোর অন্দরে রাজনীতির প্রবেশ ঘটতে শুরু করেছিল। বামেরা কখনো প্রকাশ্যে দুর্গাপুজোর আয়োজক বা সরাসরি যুক্ত না থাকলেও নিজেদের অদৃশ্য প্রভাব বজায় রাখত। সেই আমলেই দুর্গাপুজোকে নিখাদ ধর্মীয় আচারের বদলে স্রেফ ‘উৎসব’ হিসেবে প্রচার করার ট্রেন্ড শুরু হয়। পরবর্তীকালে ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই স্লোগানকে সামনে নিয়ে আসেন। কলকাতার তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিম মন্তব্য করেছিলেন যে তাঁর কাছে দুর্গাপুজো কোনো ধর্মীয় আচার নয়, বরং একটি সার্বজনীন উৎসব। যা নিয়ে সেই সময়ের হেভিওয়েট মন্ত্রী প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। বর্তমান শাসক দলের আমলেই রাজ্যজুড়ে কন্যাশ্রীসহ নানা সরকারি প্রকল্পের আদলে থিম তৈরি করার হিড়িক পড়ে যায়। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই একসঙ্গে কয়েক হাজার পুজো উদ্বোধন করার নজির গড়েন। এমনকি দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার আগেই পুজোর ফিতে কাটা শুরু হয়ে যায়। অনেক মণ্ডপে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর নিজ হাতে প্রতিমার চক্ষুদান করার ঘটনাও সামনে এসেছে। মণ্ডপে মণ্ডপে তাঁর লেখা ও কণ্ঠে গাওয়া থিম সং বাজানো বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। পুজো কমিটিগুলিকে সরকারি অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর তৎকালীন শাসক দলের প্রভাবশালী নেতাদের পক্ষ থেকে নিদান দেওয়া হয় যে, মণ্ডপে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ব্যানার বা পোস্টার না টাঙালে পরের বছর থেকে অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হবে। কবে থেকে পুজো মণ্ডপের দরজা খুলবে আর কবেই বা প্রতিমা বিসর্জন হবে, তার খুঁটিনাটি সবকিছুই নির্ধারণ করতে শুরু করে প্রশাসন ও শাসক দল। সে সময় শাসক শিবিরের নেতা-মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্ফীত হওয়ার পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা পুজো কমিটিগুলির আকারও বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে থাকে। পুজোকে হাতিয়ার করে তোলাবাজির গুরুতর অভিযোগও কম ওঠেনি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজ্যে পালাবদল ঘটলেও নতুন করে পুজোর পবিত্রতা বজায় রাখা নিয়ে সচেতনতার ডাক দেওয়া জরুরি। উৎসব হোক, কিন্তু তা যেন মূল আরাধনাকে গ্রাস না করে।