চার দিন আগেও ছিল স্বর্গের মতো সুন্দর হিমালয়! ফিরে এসে সাংবাদিক দেখলেন এক বুক কান্নায় ভেজা ‘নিখোঁজ মুখের দেওয়াল’

নিখোঁজ মানুষকে নিয়ে সবচেয়ে নির্মম শব্দটি হয়তো ‘মৃত্যু’ নয়, বরং ‘অপেক্ষা’! কারণ মৃত্যু অন্তত একটি স্পষ্ট উত্তর দিয়ে যায়, কিন্তু নিখোঁজ মানুষ পেছনে রেখে যায় কেবল হাজারটা যন্ত্রণাদায়ক প্রশ্ন। নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এভাবেই নিজের কলমে এক হৃদয়বিদারক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সাংবাদিক সুরেন্দ্র ফুয়াল।

স্বর্গের মতো সুন্দর উপত্যকা নিমেষে পরিণত নরকে
মাত্র চার দিন আগেও কাঠমান্ডু থেকে লাংটাংয়ের পাহাড়, বর্ষার সবুজ ঢাল, মেঘের ফাঁকে উঁকি মারা তুষারচূড়া দেখে মনে হয়েছিল পৃথিবীর ব্যস্ততা থেকে দূরে কোথাও সময় যেন সত্যিই থেমে রয়েছে। কিন্তু ঠিক তার চার দিন পরেই সেই এলাকা এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। গত ২৬ আগস্ট লাংটাং পর্বতের উত্তর ঢালে প্রায় সাত হাজার মিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ার জেরে লহেন্দে খোলা ফুলে ওঠে এবং তা ভুটে কোশিতে মিশে এক উন্মত্ত জলপ্রাচীরের রূপ নেয়। মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নেপাল-চিন সীমান্তের গিরং বন্দর এবং শ্যাব্রু বেঁসির মতো জনপদ মুহূর্তের মধ্যে জলের তোড়ে ভেসে যায়।

হাসপাতালের বাইরের সেই মর্মান্তিক দেওয়াল
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের বাইরে গিয়ে এই বিপর্যয়ের আসল রূপ দেখতে পান সাংবাদিক। সেখানে আহতদের ওয়ার্ডের বাইরে একটি দেওয়াল জুড়ে টাঙানো রয়েছে শত শত মানুষের ছবি। ছোট ছোট মুখের সেই ছবিগুলিতে কেউ হাসছে, কারও গায়ে স্কুলের পোশাক, আবার কারোর বা সাধারণ জামাকাপড়। কিন্তু তাঁরা কেউ আর ফিরছেন না। প্রিয়জনদের খুঁজে বেড়ানো অসহায় পরিবারের মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার রোল ভারী করে তুলেছে হাসপাতালের চারপাশ।

সেখানেই কাল্পনা ও কোপিলা শ্রেষ্ঠ নামের দুই বোনের সঙ্গে দেখা হয়, যাঁদের পরিবারের ১০ জন সদস্য বানের জলে ভেসে গিয়েছেন। তাঁদের একটাই আকুতি, বেঁচে আছেন কি না জানেন না, কিন্তু অন্তত জানতে চান ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন। শ্যাব্রু বেঁসির বাসিন্দা ছেওয়াং লামাও জানান, তাঁর গোটা শহর তো বটেই, স্ত্রী-পুত্র ও মা পর্যন্ত নিখোঁজ।

প্রকৃতির এই রূপ বদল এবং গলে যাওয়া হিমালয়ের বরফ যে আগামী দিনে আরও কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, নেপালের এই হড়পা বান যেন তারই এক চরম ও সতর্কবার্তা দিয়ে গেল।