ফ্রিজ, এসি থেকে চার চাকা গাড়ি— থাকলেই বাতিল হবে রেশন কার্ড? বড় পদক্ষেপ প্রশাসনের!

রেশন কার্ড বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় একটি নথি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ একদিকে যেমন সরকারি পরিচয়পত্র পান, তেমনই বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে রেশন সামগ্রী সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এই কার্ড অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি অঙ্গ। তবে দীর্ঘদিন ধরেই শাসক দল থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল ও বিরোধী দলগুলি দাবি করে আসছে যে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় প্রচুর পরিমাণে ভুয়ো রেশন কার্ড তৈরি করা হয়েছে। এমনকী বহু ক্ষেত্রে রেশন কার্ডের জগত ও বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগও ওঠে। এই ভুয়ো কার্ডগুলি ব্যবহার করে একশ্রেণির অসাধু মানুষ বেআইনিভাবে সরকারি অনুদান ও খাদ্যসামগ্রী তুলে নিচ্ছেন, যার ফলে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে সরকার। সবচেয়ে বড় কথা, এই দুর্নীতির কারণে প্রকৃত এবং যোগ্য দরিদ্র প্রাপকরা অনেক সময় তাঁদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আকারে রেশন কার্ডের তথ্য যাচাই বা ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রশাসন, যার জেরে বহু ভুয়ো কার্ড একে একে বাতিল করা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গে এখনও প্রচুর সংখ্যায় অবৈধ বা ভুয়ো রেশন কার্ড সক্রিয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে দীর্ঘদিন আগে মারা গেছেন এমন মৃত ব্যক্তিদের নাম এখনও রেশন কার্ডের তালিকায় ঝুলছে এবং তাঁদের নামে বরাদ্দ খাদ্যসামগ্রী তুলে নেওয়া হচ্ছে। আবার অন্যদিকে, যাঁদের আর্থিক সচ্ছলতা যথেষ্ট বেশি এবং যাঁরা আর্থিকভাবে অত্যন্ত উন্নত, তাঁদের বাড়িতেও অবৈধভাবে এই কার্ড রাখা হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত অভাবগ্রস্ত মানুষরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই সমস্যা চিরতরে দূর করতে সরকার নতুন করে কঠোর হাতে রেশন কার্ড বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে ঠিক কোন কোন নিয়মের ভিত্তিতে এই কার্ডগুলি বাতিল করা হবে, তার একটি নির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে প্রশাসনের তরফ থেকে। বিশেষ করে শহর এবং গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য এই নিয়মের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা রাখা হয়েছে, যা প্রতিটি কার্ডধারীর জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
শহর এলাকার বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে যে নিয়মগুলি বলবৎ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—পরিবারের যদি তিনটি বা তার বেশি ঘরযুক্ত সম্পূর্ণ পাকা বাড়ি থাকে, তবে তাদের রেশন কার্ড বাতিল হতে পারে। এ ছাড়াও বাড়িতে চার চাকা অথবা দুই চাকা বিশিষ্ট মোটর গাড়ি থাকলেও এই কার্ডের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। যাঁদের বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার (AC), ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও কার্ড বাতিল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বাড়িতে ফ্রিজ, ল্যান্ডলাইন টেলিফোন বা ওয়াশিং মেশিন থাকলেও রেশন কার্ড বাতিল করা হতে পারে। যাঁদের পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত ইনকাম ট্যাক্স বা প্রফেশনাল ট্যাক্স প্রদান করেন, তাঁদের কার্ডও বাদ যাবে। পাশাপাশি, রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের যেকোনো গেজেটেড কর্মচারী কিংবা সরকার পোষিত বা সাহায্যপ্রাপ্ত অফিসের নিয়মিত কর্মচারীদের পরিবারও এই সুবিধার আওতা থেকে বাদ পড়তে পারেন।
অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকার জন্য সরকার সম্পূর্ণ আলাদা ও নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। গ্রামীণ অঞ্চলে কোনো ব্যক্তির যদি টু-হুইলার, থ্রি-হুইলার বা ফোর-হুইলার গাড়ি থাকে, তবে তাঁর রেশন কার্ড বাতিল হতে পারে। এ ছাড়া যদি কারও নামে ফিশিং বোট বা মাছ ধরার নৌকা রেজিস্ট্রিকৃত থাকে, তবেও কার্ড বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত বড় ট্র্যাক্টর বা অন্য কোনো ভারী যান্ত্রিক বাহন থাকলে কার্ড নিয়ে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। আবার ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি ক্রেডিট লিমিটযুক্ত কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (KCC) যাঁদের রয়েছে, তাঁদের রেশন কার্ডও বাতিল করা হবে। সরকারের কাছে রেজিস্টার্ড কৃষিকাজ ছাড়াও যদি অন্য কোনো বাণিজ্যিক ব্যবসা আইনগতভাবে রেজিস্টার্ড থাকে, তবেও এই কার্ড রাখা যাবে না। পরিবারের কোনো সদস্যের মাসিক বা নির্দিষ্ট আয় যদি ১৫ হাজার টাকা বা তার বেশি হয়, কিংবা কেউ যদি নিয়মিত ইনকাম ট্যাক্স প্রদান করেন, তবে তাদের কার্ড বাতিল করা হবে। এ ছাড়া গ্রামে যাঁদের তিনটি বা তার বেশি পাকা ঘর রয়েছে, সেচযুক্ত আড়াই একর বা তার বেশি জমি রয়েছে কিংবা পাঁচ একর বা তার বেশি দুই বা তিন ফসলি জমি রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও এই কোপ পড়তে পারে। এমনকি বাড়িতে ল্যান্ডলাইন ফোন বা ফ্রিজ থাকলেও রেশন কার্ড বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের এই কড়া পদক্ষেপের ফলে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার কার্ড যাচাই করে বাতিল করা হয়েছে।