৩০ বছর পরও কেন কাঁদায় অযোধ্যা কাণ্ড? মুলায়মের সেই বিতর্কিত নির্দেশ কীভাবে বদলে দিয়েছিল দেশের রাজনীতি!

উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক ময়দানে এমন বহু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শুধু রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। এমনই একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অধ্যায় রচিত হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৩০শে অক্টোবর এবং ২রা নভেম্বর অযোধ্যার পবিত্র মাটিতে, যখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদবের নির্দেশে পুলিশ করসেবকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল। সেই সময় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সাফাই দেওয়া হয়েছিল যে, বিতর্কিত কাঠামো রক্ষা করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু রাম মন্দির আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে হাজার হাজার করসেবকের অযোধ্যা অভিমুখে যাত্রার জেরে গোটা পরিস্থিতি রক্তে ভেসে গিয়েছিল। প্রায় ৩৬ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের রেশ কাটেনি; বরং সাম্প্রতিক সময়ে রাম মন্দির সংক্রান্ত অনুদান ও কথিত দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক তির্যক মন্তব্যের জেরে এই পুরোনো প্রসঙ্গ নতুন করে দেশের রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
সালটা যখন ১৯৯০, তখন রাম মন্দির আন্দোলন তার চরম শিখরে পৌঁছেছিল এবং দেশজুড়ে হাজার হাজার করসেবক অযোধ্যামুখী হয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদব কঠোর হাতে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেন। ৩০শে অক্টোবর ও ২রা নভেম্বরের সেই পুলিশি গুলিবর্ষণের ঘটনায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এই একটিমাত্র সিদ্ধান্ত মুলায়ম সিং যাদবের রাজনৈতিক পরিচয় চিরতরে বদলে দেয়। একদিকে তাঁর সমর্থকরা তাঁকে আপসহীন ‘ধর্মনিরপেক্ষ নেতা’ হিসেবে মহিমান্বিত করতে শুরু করেন, অন্যদিকে বিরোধীরা তাঁকে ‘করসেবকদের রক্তে হাত রাঙানো মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে তীব্র আক্রমণ শানাতে থাকেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দীর্ঘ ২৬ বছর পর ২০১৬ সালে নিজের আত্মজীবনী প্রকাশের প্রাক্কালে মুলায়ম সিং যাদব এই সিদ্ধান্তের পক্ষেই সাফাই গেয়েছিলেন। তিনি দম্ভের সুরেই ঘোষণা করেছিলেন যে, বাবরি মসজিদ রক্ষা করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব ছিল; তাই প্রয়োজনে ১৬ জনের জায়গায় ৩০ জনের প্রাণ গেলেও তিনি এই নির্দেশ বদলাতেন না। তাঁর এই বেপরোয়া ও অনমনীয় মন্তব্য আজও রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, সেই উত্তাল দিনগুলোতে মুলায়ম সিং যাদবের আরেকটি উক্তি দারুণভাবে ভাইরাল হয়েছিল—তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, “অযোধ্যার ওপর দিয়ে একটি পাখিও উড়তে পারে না।” কিন্তু কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরেও ইতিহাসের চাকা ঘুরতে বেশি সময় লাগেনি। এর ঠিক দু’বছর পর, ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর করসেবকদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ধূলিস্যাৎ হয়ে যায় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। সেই সময় উত্তরপ্রদেশে কল্যাণ সিংয়ের নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। এই একটি মাত্র ঘটনা উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিকে পুরোপুরি মেরুকরণ করে দেয়। রাম মন্দির আন্দোলন ভারতীয় জনতা পার্টির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়, আর অন্যদিকে সমাজবাদী পার্টি দলগতভাবে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটের প্রধান অবিসংবাদিত মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজকের ২০২৬ সালে এসে হঠাৎ কেন আবার সেই ৩৬ বছর আগের পুরনো ভূত ফিরে এল? বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধীরা রাম মন্দির ট্রাস্টের অনুদান ও কথিত দুর্নীতির অভিযোগে শাসক শিবিরকে তীব্র আক্রমণ করছেন। সমাজবাদী পার্টির বর্তমান সভাপতি অখিলেশ যাদব থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিরোধী সাংসদরা এই নিয়ে একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলছেন। এমনকী অতীতে পাপ্পু যাদবের মতো নেতারাও সাধুর ছদ্মবেশ ধারণ করে সংসদ চত্বরে নাটকীয় কায়দায় এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। শাসক ও বিরোধী শিবিরের এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক হানাহানির ফলেই ১৯৯০ সালের সেই মর্মান্তিক স্মৃতি এবং মুলায়ম সিং যাদবের পুরনো বিতর্কিত মন্তব্যগুলো আবারও ডেইলিমেশন বা সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় টপ ট্রেন্ডিং হয়ে উঠেছে। পরিশেষে বলা চলে, মুলায়ম সিং যাদবের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে বহু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত থাকলেও, অযোধ্যা কাণ্ডের এই কালো অধ্যায়টি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেশি আলোচিত, বিতর্কিত এবং নির্ণায়ক মাইলফলক হিসেবে চিরকালের মতো খোদাই হয়ে থাকবে।