জ্বালানিতে আত্মনির্ভর ভারতের ইতিহাস! ৮৪,০৮৪ কোটির ‘সমুদ্র মন্থন’ প্রকল্পে মোদী সরকারের ঐতিহাসিক ছাড়পত্র

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী এক পদক্ষেপে অফশোর হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধান এবং উৎপাদন সংক্রান্ত ‘সমুদ্র মন্থন’ প্রকল্পে আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র প্রদান করেছে। পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের অধীনে পরিচালিত হতে চলা এই জাতীয় অফশোর অনুসন্ধান প্রকল্পের জন্য ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৮৪,০৮৪ কোটি টাকার বিশাল তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশ ও শক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে এই মেগা প্রকল্পটিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন এই প্রকল্পের প্রয়োজন?
পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানির দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম গ্রাহক হিসেবে অবস্থান করছে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের জ্বালানির বিপুল চাহিদা মেটাতে তেল আমদানিতে প্রতি বছর প্রায় ১৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৩ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাজারের ওঠানামার প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ভারতের মতো দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতির জন্য নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আত্মনির্ভর ভারতের রূপকল্পকে বাস্তবায়িত করতে মোদী সরকার বিগত এক দশকে বেশ কিছু যুগান্তকারী সংস্কার সাধন করেছে।
অতীতে যেসব ‘নো-গো’ জোন ছিল, তা আজ উন্মুক্ত
২০১৪ সাল থেকে সরকার হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধান ও উৎপাদন ক্ষেত্রটিকে সম্পূর্ণ গতিশীল করতে একাধিক কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে। অতীতে যে সমস্ত অফশোর অঞ্চলকে কঠোরভাবে ‘নো-গো’ জোন বা নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তার ৯৯ শতাংশেরও বেশি এখন বাণিজ্যিক অনুসন্ধানের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, ভারতের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের প্রায় দশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্রথমবারের মতো তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে। প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে এবং ব্যবসার স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকার প্রথাগত প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি পদ্ধতি থেকে সরে এসে রেভিনিউ শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট মডেলে রূপান্তরিত হয়েছে।
আইনি পরিকাঠামোকে সময়োপযোগী করতে প্রবর্তিত হয়েছে ‘অয়েলফিল্ডস রেগুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৫’। পাশাপাশি, ‘পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস রুলস, ২০২৫’ সংস্কারগুলির সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে ব্যবসার পদ্ধতিকে আরও সহজতর করেছে।
‘সমুদ্র মন্থন’ প্রকল্পের ৪টি প্রধান স্তম্ভ
এই মেগা প্রকল্পটিকে সফল করার জন্য প্রধানত চারটি সুনির্দিষ্ট অংশে ভাগ করা হয়েছে:
প্রথম অংশ: আধুনিক অফশোর সাইসমিক ডেটা সংগ্রহ ও উন্নত প্রক্রিয়াকরণের জন্য ২৮,৫৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অংশ: গভীর সমুদ্রে মোট ৬০টি উচ্চপ্রযুক্তির অনুসন্ধানী কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার জন্য ৪৩,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই পর্যায়ে সরকার প্রতিটি কূপের ক্ষেত্রে যোগ্য খরচের ৫০ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ৬৭৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।
তৃতীয় অংশ: নতুন আবিষ্কৃত তেল ও গ্যাসকে দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষ্যে একটি সাধারণ অফশোর পরিকাঠামো হাব বা কমন ইনফ্রাস্ট্রাকচার হাব তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য ১০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
চতুর্থ অংশ: আধুনিক তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং পরিষেবা জোন স্থাপনের জন্য ২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি তেল অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম এবং উন্নত পরিষেবার স্থানীয়করণকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হবে।
উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানির খরচ হ্রাসের লক্ষ্য
এই ব্যাপক অনুসন্ধানের মূল লক্ষ্য হলো ভারতের অভ্যন্তরীণ তেল ও গ্যাসের উৎপাদন ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করা। বর্তমানে দেশের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৬২ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেল সমতুল্য বা এমএমটিওই স্তরে রয়েছে, যা এই প্রকল্পের হাত ধরে বাড়িয়ে প্রায় ৮০ এমএমটিওই করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের হাইড্রোকার্বন সম্পদের মোট পরিমাণ ১.৬ বিলিয়ন টন তেল সমতুল্য থেকে বাড়িয়ে ২.২ বিলিয়ন টন করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সফল হলে প্রতি বছর তেল আমদানির খরচ প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। ফলস্বরূপ, ভারতের জ্বালানি নির্ভরতা বহিরাগত বাজারের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে।