৪,৫০০ বছরের পুরনো নিদর্শনকে ‘পোশাক’ পরানোর চেষ্টা? মহেঞ্জোদারোর মূর্তির ছবি ঘিরে তীব্র বিতর্ক

সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ হলো মহেঞ্জোদারোর সেই বিখ্যাত ‘ডান্সিং গার্ল’ বা নৃত্যরত তরুণীর মূর্তি। প্রায় ৪,৫০০ বছরের পুরনো এই ব্রোঞ্জ মূর্তিটি এতদিন বিশ্বজুড়ে তার স্বাভাবিক শিল্পগুণের জন্যই সমাদৃত হয়ে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে সেই মূর্তিটিই জড়িয়ে পড়েছে এক বড় বিতর্কে। অভিযোগ, নবম শ্রেণির চারুকলা শিক্ষার পাঠ্যবইয়ে এই মূর্তিকে উপস্থাপন করার সময় তার মূল রূপ বদলে দেওয়া হয়েছে।

১৯২৬ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আর্নেস্ট ম্যাকে এই মূর্তিটি আবিষ্কার করেন। মাত্র চার ইঞ্চির এই ছোট্ট ব্রোঞ্জ মূর্তিতে ফুটে উঠেছে এক কিশোরীর প্রাণবন্ত নৃত্যের ভঙ্গি, তার হাতে থাকা অজস্র চুড়ি এবং গলায় থাকা অলঙ্কার। এই মূর্তির স্বাভাবিক শারীরিক গঠন এবং আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি প্রাচীন ভারতের শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শন। বর্তমানে এটি দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে NCERT-এর বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে এই মূর্তির আসল ছবিই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এমনকি গত ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলেও এই ছবির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত নবম শ্রেণির ‘History of Arts’ অধ্যায়ের একটি ছবিকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সেখানে দেখা গেছে, মূর্তির কাঁধের নিচ থেকে শরীরের মাঝামাঝি অংশ পর্যন্ত একটি কালো ছায়ার মতো আবরণ বা পোশাকের আস্তরণ যোগ করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ ও শিল্পবিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, হাজার বছরের পুরনো একটি প্রত্নসম্পদকে এ ধরণের বিকৃতি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাঁদের মতে, এটি আসলে প্রাচীন ঐতিহ্যকে বর্তমানের চোখে ‘পোশাক পরিয়ে’ ঢেকে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।

এই বিতর্ক সামনে আসতেই জানা যায়, পাঠ্যবই তৈরির সময় মূর্তির আসল ছবি ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছিলেন খোদ সরকারি বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু রহস্যজনকভাবে শেষ মুহূর্তে প্রকাশিত বইয়ে সেই পরিবর্তিত ছবিই স্থান পায়। এই পরিবর্তন কার সিদ্ধান্তে বা কী কারণে করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষামহল। তবে সমালোচনার মুখে পড়ে নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। NCERT-এর ডিরেক্টর দীনেশ সাকলানি জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণে দ্রুত আসল ছবিটিই ফিরিয়ে আনা হবে এবং পরবর্তী মুদ্রিত সংস্করণেও প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। কার্যত, বিতর্কের মুখে দাঁড়িয়ে নতি স্বীকার করল NCERT। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, একটি ধ্রুপদী নিদর্শনের রূপ কেন বদলে দেওয়া হলো? এই ঘটনার নেপথ্যে কি কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শগত কারণ রয়েছে, নাকি এটি নিছকই এক ভুল? শিক্ষা ও ইতিহাসের অঙ্গনে এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।