“আমি নিজেকে বিক্রি করি না, বিস্ফোরক জয় সেনগুপ্ত, মুখোশের আড়ালে সমাজের আসল ছবি তুলে ধরেন যিনি”

‘Work hard in silence, let your success make the noise’ — এই প্রবাদ বাক্যটির যেন এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি অভিনেতা জয় সেনগুপ্ত। তথাকথিত বাণিজ্যিক সুপারস্টারের তকমা থেকে শতহস্ত দূরে থেকেও তিনি থিয়েটার, ওটিটি, টেলিভিশন এবং সিনেমায় নিজের কাজের মাধ্যমে এক নীরব বিপ্লব এনেছেন। বিশ্বাস না হলেও সত্যি, হলিউড তারকা ক্রিস ইভান্স অভিনীত ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’-এর হিন্দি ডাবিংয়ের পেছনের কণ্ঠটি তারই।
‘অহনা’ ও মুখোশের আড়ালের সমাজ
সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত প্রমিতা ভৌমিক পরিচালিত ছবি ‘অহনা’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাধিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর দর্শক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। সুদীপ্তা চক্রবর্তী ও জয় সেনগুপ্ত অভিনীত এই সিনেমাটি সভ্য মধ্যবিত্ত সমাজের মুখোশ উন্মোচন করে। সিনেমাটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত অভিনেতা জয় বলেন, “নারীকেন্দ্রিক ছবির থিম, অভিনয় এবং বেসিক ট্রিটমেন্ট সকলেরই মন জয় করেছে। সমাজের ক্ষত এবং মুখোশ পরা মানুষদের এই ছবি ভাবাচ্ছে।”
সাধারণত নতুন পরিচালক-প্রযোজকদের সঙ্গে কাজ করতে ভালোবাসেন জয়। তবে ‘অহনা’র চিত্রনাট্য শোনার পর কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। “আসলে চিত্রনাট্য শোনার পর আমি ঠিক করে ফেলেছিলাম এই সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হবই। তবে একটা দ্বিধা ছিল। পরিচালক নতুন, তিনি এই ধরনের বিষয়কে কীভাবে টেকনিক্যালি হ্যান্ডেল করবেন, তা নিয়ে একটা চিন্তা কাজ করছিল। কিন্তু প্রমিতার গল্পের বলার মধ্যে একটা সততা ও স্বচ্ছতা ছিল। তিনি জানতেন কতটুকু নিতে হবে আর কতটুকু নয়। তার এই আত্মবিশ্বাস দেখে আমার সব দ্বিধা নিমেষে কেটে যায়।”
সিনেমা সমাজের আয়না, পরিবর্তনের হাতিয়ার নয়
‘অহনা’ ছবিতে জয়ের চরিত্রটির নাম নীল। একজন প্রোগ্রেসিভ, লিবারেল ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে পুরুষতন্ত্রের কিছু বীজ লুকিয়ে আছে। স্ত্রীর সাফল্যে তার মধ্যে ইর্ষা দেখা যায়, যা তার পুরুষত্বের অক্ষমতাকে ঢাকতে মুখোশ হয়ে কাজ করে। এই প্রসঙ্গে জয় বলেন, “শিল্প কখনও সমাজ পরিবর্তন করতে পারে না। শিল্পের কাজ শুধু আয়না দেখানো। এখন আয়না দেখেও মুখ ফিরিয়ে নিলে কিছু করার নেই।”
তিনি আরও বলেন, “সিনেমা কিছু প্রশ্ন সমাজের সামনে তুলে ধরে, যার উত্তর দর্শকদের খুঁজতে হয়। প্রতি বছর দুর্গাপূজা হলেও সবাই দুর্গা হয়ে যান না। মুখ বুজে মেনে নেন জীবনে থাকা অসুরের অসহ্য পীড়ন। নারীর যাতনা-যন্ত্রণা সাময়িক নয়, তা নিয়ে লড়াই চলতেই থাকবে।”
টলিউডে রাজনীতির ‘নোংরামি’
বাংলা বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের নোংরা রাজনীতির খেলা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন জয় সেনগুপ্ত। ফেডারেশনের দাদাগিরি, টেকনিশিয়ানদের অসহযোগিতা এবং শুটিং বন্ধ হওয়ার মতো ঘটনা ইন্ডাস্ট্রির করুণ ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। জয় বলেন, “সারা বিশ্বে সাংস্কৃতিক রাজনীতি কাজ করে। বাংলায় সেটা আরও বেশি। এখানে বাজারের রাজনীতি আছে, আবার রাজনীতিরও রাজনীতি আছে।”
তার কথায়, “বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি একটা ছোট ইন্ডাস্ট্রি এবং দর্শকও কম। তা সত্ত্বেও এখানে নিজেদের জায়গা ধরে রাখার জন্য ব্যাপক খাওয়া-খাওয়ি চলে। অনেক নতুন প্রতিভাবান ছেলে-মেয়েরা এই পেশায় ঢুকতেই পারে না। নতুন কেউ ঢোকার চেষ্টা করলে তাকে নানাভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়। সরকারি হল দেওয়া হবে না, মাল্টিপ্লেক্সে তিনদিন পর সিনেমা চালাতে দেওয়া হবে না, পোস্টার ছিঁড়ে দেওয়া কিংবা শো টাইম বদলে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।” জয় আক্ষেপ করে বলেন, “এই নোংরামি না করলে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির অনেক উন্নতি হতো। আমরা সেই বাধা ধরা কাজ আর গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকি। তাই বাংলা সিনেমার উন্নতি হয় না।”
২৭ বছরের দীর্ঘ অভিনয় জীবন: আজও প্রচারবিমুখ
১৯৯৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত গোবিন্দ নিহালানি পরিচালিত ‘হাজার চুরাশির মা’ সিনেমা দিয়ে জয় সেনগুপ্তের অভিনয় জীবনের পথ চলা শুরু। এতগুলো বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে তিনি বলেন, “আমি নিজেকে কোনোদিনই বিক্রি করিনি। পার্টি বা নেটওয়ার্কিং করে কাজ খুঁজিনি। আমি কাজ দেখিয়ে কাজ পেয়েছি।”
কলকাতায় জন্ম হলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন দিল্লি ও নেপালে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর নাট্যদল জন নাট্য মঞ্চে যোগ দেন। এরপর তিনি নিউ দিল্লির লিভিং থিয়েটার অ্যাকাডেমি থেকে নাটকে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। হাবিব তানভির, সফদর হাসমি, বেরি জন-এর মতো কিংবদন্তি অভিনেতাদের সান্নিধ্যে এসে তার অভিনয় সত্তা আরও ধারালো হয়েছে।
জয় জানান, “আমি যেটুকু কাজ করেছি তার ৭০ শতাংশ নিয়ে আমি গর্বিত। আমার মরার পরেও ‘পাতালঘর’ সিনেমা সার্থক হয়ে থাকবে। আমি কখনই ভাবিনি অভিনয় জগতে এত লম্বা ক্যারিয়ার চলবে। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি বিনোদন জগতে আমার কাজ বেড়েছে। **‘ব্ল্যাক ওয়ারেন্ট’, ‘খাকি’, ‘নাইট ম্যানেজার’, ‘আরিয়া’, ‘হ্যালো’**র মতো সিরিজেও কাজ করেছি।”
প্রচারবিমুখ এই অভিনেতা বলেন, “আমি নিজেকে বিক্রি করতে পারি না। আমি ইমেজে বাঁচি না, আসলটা দেখি। লোকে তাতে আগ্রহ থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে।”
বলরাজ সাহানি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং ওম পুরীর মতো অভিনেতাদের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন জয়। সম্প্রতি নাসিরুদ্দিন শাহের সঙ্গে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া – দ্য টাইটান স্টোরি’ সিরিজে কাজ করেছেন। এছাড়া অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গেও ‘আলাদিন’ সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছেন।