ক্যাচ মিস তো ম্যাচ মিস! শ্রীলঙ্কায় পা রেখেই গম্ভীরের কড়া নির্দেশ, টিম ইন্ডিয়ার এই লজ্জাজনক রোগ কি সারবে?

শ্রীলঙ্কায় পা রেখেই টিম ইন্ডিয়া তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে এবং কোচ গৌতম গম্ভীরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কলম্বোর এনসিসি গ্রাউন্ডে ঘাম ঝরাতে শুরু করেছে দল। তবে অনুশীলনের শুরুতেই ব্যাটিং বা বোলিংয়ের চেয়ে কোচ গম্ভীরের প্রধান ফোকাস ছিল দলের ফিল্ডিংয়ের ওপর। বিগত বেশ কয়েক মাস ধরে ক্যাচ ফেলার এই মারাত্মক দুর্বলতা টিম ইন্ডিয়ার জন্য এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রিকেটের ফরম্যাট যাই হোক না কেন, প্রতিপক্ষ বা খেলার পরিস্থিতি বদলালেও ভারতীয় দলের স্লিপ ফিল্ডিং এবং ক্যাচিংয়ের এই দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেন কিছুতেই সারছে না। শ্রীলঙ্কা সফরে প্রথম অনুশীলন পর্বেই ফিল্ডিং নিয়ে এই কঠোর কসরত শুরু হওয়া থেকেই স্পষ্ট যে, দলের অন্দরে এই দুর্বল দিকটি নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার কলম্বোর এনসিসি গ্রাউন্ড থেকে সামনে আসা অনুশীলনের ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে, শুভমান গিল, যশস্বী জয়সওয়াল, কেএল রাহুল, ঋষভ পান্ত এবং ধ্রুব জুরেলের মতো তারকারা স্লিপে দাঁড়িয়ে ক্যাচ ধরার নিখুঁত কলাকৌশল রপ্ত করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখলে যে কারোরই চোখ কপালে উঠবে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য ও জিম্বাবুয়ে সফর মিলিয়ে মোট ১৩টি ম্যাচ খেলেছিল টিম ইন্ডিয়া, যার মধ্যে যুক্তরাজ্যে খেলা ১০টি ম্যাচে ১১টি এবং জিম্বাবুয়েতে খেলা ৩টি ম্যাচে ১০টি—সবমিলিয়ে মাত্র ১৩ ম্যাচে একঝাঁক ক্যাচ মাটিতে ফেলে রেকর্ড গড়েছে ভারতীয় ফিল্ডাররা। অর্থাৎ এই দুই বিদেশ সফরে মাত্র কয়েকটি ম্যাচেই ২১টি ক্যাচ হাতছাড়া করেছে দল, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উচ্চমানে রীতিমতো অগ্রহণযোগ্য।
এমনকি সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও একই হতাশাজনক চিত্র দেখা গিয়েছিল, যেখানে গ্রুপ পর্বের ১০টি দলের মধ্যে টিম ইন্ডিয়ার ক্যাচিং পারফরম্যান্স ছিল সবচেয়ে নিকৃষ্ট। বিশিষ্ট ক্রীড়া বিশ্লেষক ও প্রাক্তন ফাস্ট বোলার বরুণ অ্যারন এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে ক্রিকইনফোর সাথে কথোপকথনে বলেন যে, গত ১২ মাসের হিসাব কষলে টিম ইন্ডিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে খারাপ ক্যাচিং দলে পরিণত হয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে প্রতি ম্যাচেই ভারতীয় ফিল্ডাররা গড়ে দুটি থেকে তিনটি করে সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেছিল, যার ফলে দলের সামগ্রিক ক্যাচিং সাকসেস রেট বা সাফল্যের হার ৭০ শতাংশের কোঠাও স্পর্শ করতে পারেনি।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তা টেস্ট ক্রিকেটের পরিসংখ্যান দেখলেও স্পষ্ট হয়ে যায়। গত বছর ইংল্যান্ডের মাটিতে খেলা পাঁচ ম্যাচের হাই-ভোল্টেজ টেস্ট সিরিজে ভারতীয় দল একা হাতে মোট ২৩টি ক্যাচ ফেলেছিল, যেখানে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড দল হাতছাড়া করেছিল মাত্র ১৮টি সুযোগ। বিশেষ করে ওই সিরিজের প্রথম দুটি টেস্টেই ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে মোট ১৩টি ক্যাচ ফেলেছিলেন ফিল্ডাররা। এর মধ্যে কেবল লিডসের প্রথম টেস্ট ম্যাচেই আটটি ক্যাচ পড়েছিল, যার মধ্যে তরুণ ওপেনার যশস্বী জয়সওয়াল একাই স্লিপে তিনটি এবং আউটফিল্ডে একটি সহ মোট চারটি ক্যাচ মিস করেছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অজিঙ্কা রাহানে, রোহিত শর্মা এবং বিরাট কোহলির মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতি টিম ইন্ডিয়ার স্লিপ ফিল্ডিং এবং সামগ্রিক ডিফেন্সিভ কমপ্রিহেনশনে এক বিরাট শূন্যতা তৈরি করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছিল গত বছরের সেই ইংল্যান্ড সফরে। অতীতে যখন রাহানে, রোহিত ও কোহলি দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন, তখন ২০১৮ এবং ২০২১-২২ সালের ইংল্যান্ড সফরে ভারতীয় দল পুরো সিরিজে মাত্র ১৩টি ক্যাচ ফেলেছিল। অথচ তাঁদের অবসরের বা অনুপস্থিতির পর ২০২৫ সালে সেই ক্যাচ মিসের সংখ্যা একলাফে লাফিয়ে বেড়ে সোজা ২৩-এ গিয়ে ঠেকেছে। ভারতীয় দলের হেড কোচ গৌতম গম্ভীর ও টিম ম্যানেজমেন্ট যে এই পরিসংখ্যান এবং দলের ভঙ্গুর ফিল্ডিং গ্রাফ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল, তা শ্রীলঙ্কার প্রথম অনুশীলন সেশনেই পরিষ্কার হয়ে গেছে।