৮ বছর ধরে নেই দোকান, অথচ বকেয়া ভাড়ার দাবিতে আইনি নোটিশ পাঠাল পুরসভা! কাঠগড়ায় প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্বপন সাহা

দোকান ঘরের চাবি তো দূরঅস্ত, উল্টো ৮ বছর আগের বকেয়া ভাড়া বাবদ একেবারে ৭৮ হাজার টাকা মেটানোর আইনি নোটিশ পাঠাল পুরসভা! চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে তীব্র শোরগোল শুরু হয়েছে মালবাজার শহর জুড়ে। অভিযোগের সরাসরি তির মালবাজার পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্বপন সাহা এবং একদল দুর্নীতিগ্রস্ত পুর কর্মীর দিকে। খোদ বিরোধীরাও এই ঘটনায় সোচ্চার হয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি তুলেছেন।
১৪ লক্ষ টাকা জমা দিয়েও দোকান শূন্য, কেন এই অভিযোগ? মালবাজার শহরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাউথ কলোনির বাসিন্দা মামণি ধর। তাঁর অভিযোগ, ২০১৮ সালে নিজের ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য মালবাজার পুরসভার কাছে একটি দোকান ঘরের আবেদন জানান তিনি। সেই মতো সমস্ত প্রক্রিয়া মেনে তিনি পুরসভায় মোট ১৪ লক্ষ টাকা জমা দেন।
মামণি দেবীর দাবি, তাঁর কাছে পুরসভায় জমা দেওয়া ১০ লক্ষ টাকার কাসিড বা রশিদ থাকলেও, বাকি ৪ লক্ষ টাকার রশিদ তাঁকে পরে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই রশিদ আর তাঁর হাতে এসে পৌঁছয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে যে দোকানঘরটি চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল, তার নম্বর ছিল ২২১। এমনকি নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সেই দোকানে শাটারও লাগান তিনি। কিন্তু পরবর্তীতে সেই দোকানটিই অন্য কাউকে বেআইনিভাবে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ওই মহিলা।
প্রাক্তন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: ভুক্তভোগী মামণি ধরের আরও অভিযোগ, টাকা হারিয়ে বা দোকান না পেয়ে যখনই তিনি পুরসভায় দ্বারস্থ হতেন, তখনই প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্বপন সাহা ও তাঁর অনুগামীরা তাঁকে নানাভাবে হেনস্থা করতেন। এমনকি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে তাঁকে পুরসভা চত্বর থেকে বের করে দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে স্বপন সাহাকে তৃণমূল কংগ্রেস দল থেকে নিলম্বিত (Suspended) করার পর, মামণি দেবী বর্তমান চেয়ারম্যান উৎপল ভাদুড়ির কাছেও সমস্ত ঘটনা জানান। নতুন চেয়ারম্যান তাঁকে মৌখিক আশ্বাস দিলেও আদতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
চাবি নেই, উল্টে ৭৮ হাজার টাকার ভাড়ার নোটিশ! সম্প্রতি মালবাজার পুরসভার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে দায়িত্ব নেন মহকুমা শাসক। এর ঠিক পরেই গত ১০ অক্টোবর হঠাৎ করেই মামণি ধরের কাছে পুরসভার তরফে একটি নোটিশ পাঠানো হয়। আশ্চর্যজনকভাবে সেই নোটিশে অন্য একটি দোকানের নম্বর (২০১ নম্বর) উল্লেখ করে ৮ বছর অর্থাৎ ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বকেয়া ভাড়া বাবদ মোট ৭৮ হাজার টাকা জমা দিতে বলা হয়! অথচ তাঁর হাতে কোনো দিন দোকানের চাবিই তুলে দেওয়া হয়নি।
এই চরম অন্যায় ও দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে সোমবার সোজাসুজি মালবাজার পুরসভায় এক্সিকিউটিভ অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানান ক্ষুব্ধ মামণি ধর।
কী বলছে প্রশাসন ও স্থানীয় মহল? পুরসভার বর্তমান এক্সিকিউটিভ অফিসার তথা মালবাজার মহকুমার ডিএমডিসি ডাক্তার এ কে বিশ্বাস এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোথাও কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে, দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, মালবাজার পুরসভার বিরুদ্ধে লাগাতার দুর্নীতির অভিযোগ তোলা আইনজীবী সুমন শিকদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “এমন বেনিয়ম মালবাজারে নতুন কিছু নয়। প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্বপন সাহার সঙ্গে এই কেলেঙ্কারিতে পুরসভার বহু অসাধু কর্মী জড়িত। মহকুমা শাসক এবং পুলিশের উচিত অবিলম্বে এদের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত শুরু করা।”
ভুক্তভোগী মামণি ধরের সাফ কথা, “আট বছর ধরে টাকা দিয়ে হয়রান হচ্ছি। হয় আমাকে অবিলম্বে আমার দোকান বুঝিয়ে দেওয়া হোক, নয়তো আমার জমা দেওয়া সমস্ত টাকা সুদসমেত ফেরত দেওয়া হোক।” খাস পুরসভার অন্দরে এমন আর্থিক দুর্নীতি ফাঁসের ঘটনায় এখন চূড়ান্ত উত্তেজনার পারদ চড়েছে মালবাজার জুড়ে।