৫০০ বছরের পুরনো স্বপ্নাদেশ! নিমকাঠের বিগ্রহে জাগ্রত মহাকালীর অলৌকিক কাহিনি জানলে শিহরিত হবেন

জাগ্রত দেবীর অলৌকিক মাহাত্ম্য, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা লোকবিশ্বাস আর অগাধ ভক্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন ইতিহাস বুক আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে হাওড়ার বাগনানের ঐতিহ্যবাহী খালোড় কালীবাড়ি। এখানে দেবী আরাধ্যা হন জাগ্রত ‘দক্ষিণা মহাকালী’ রূপে। দীপান্বিতা অমাবস্যা ঘনিয়ে আসতেই এই ঐতিহাসিক মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে। দেবীর কৃপাদৃষ্টি পেতে ও অলৌকিক মাহাত্ম্যের সাক্ষী হতে রাজ্য তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজার হাজার দর্শনার্থী। প্রতিবছরের মতো এবারও কালীপুজো উপলক্ষে মন্দিরে সারারাত ধরে বিশেষ পুজোর বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়েছে।

ইতিহাসের পাতা উল্টে জানা যায়, প্রায় পাঁচশো বছর আগে বর্ধমানের তৎকালীন প্রভাবশালী জমিদার কন্দর্পনারায়ণ রায়ের কাছে এলাকার প্রজারা স্থানীয়ভাবে কালীপুজো শুরু করার আকুল আবেদন জানান। প্রজাদের সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে জমিদারের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে দামোদর ও রূপনারায়ণ নদীর মধ্যবর্তী চর খালোড়ে দেবী আরাধনার সূচনা ঘটে। স্থানীয় লোককথা ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, পুজো শুরুর কিছুদিন পরেই জমিদার কন্দর্পনারায়ণ রায়কে স্বপ্নে দেখা দেন মা কালী। মন্দির কমিটির অন্যতম সদস্য শচীন ভট্টাচার্য জানান, সেই ঐতিহাসিক স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরেই জমিদার খালোড়ে স্থায়ীভাবে মা কালীর প্রতিষ্ঠা করেন এবং মন্দির গড়ে তোলেন।

সূচনাপর্বে মন্দিরের বিগ্রহের রূপ ছিল কিছুটা ভিন্ন। তবে কালের নিয়মে দেবীর প্রতিমা দু’বার ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হলে নতুন বিগ্রহ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর পাশের গ্রাম বোড়ল থেকে একটি আস্ত নিমগাছের গুঁড়ি নিয়ে আসা হয় এবং তা খোদাই করে পরম নিষ্ঠায় মায়ের নতুন প্রতিমা রূপ দেওয়া হয়। সেই পবিত্র নিমকাঠের তৈরি বিগ্রহেই আজও পূজিত হয়ে আসছেন দেবী মহাকালী।

কালীপুজো বা দীপান্বিতা অমাবস্যার বিশেষ তিথিতে খালোড় কালীবাড়ির রূপ আমূল বদলে যায়। এই দিন দেবীকে চোখধাঁধানো সোনা ও রুপোর অলঙ্কারে রাজরাজেশ্বরী রূপে সাজিয়ে তোলা হয়। রাত ৯টা বাজলেই শুরু হয় বিশেষ তান্ত্রিক ও বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান। সারারাত ধরে চলে বিশেষ পুজো, মহাসন্ধ্যা আরতি এবং ঐতিহ্যবাহী ছাগবলি। পুজো সাঙ্গ হলে ভোরবেলায় উপস্থিত হাজার হাজার ভক্তের মধ্যে মহাভোগ ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়। দেবীর দর্শন পেতে বিকেল থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয় ভক্তদের ভিড়, যা রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রে রূপ নেয়।

মন্দিরের প্রধান পুরোহিত সবুজ বটব্যাল জানান, বছরের বিভিন্ন বিশেষ তিথিতে ধুমধাম করে উৎসব হলেও প্রতিদিনের নিয়ম-নীতিতে কোনো ব্যতিব্রম ঘটে না। নিত্যপুজো, রাজভোগ নিবেদন এবং সান্ধ্য আরতির সমস্ত নিয়ম অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়। তবে কালীপুজোর রাতের অলৌকিক আবহ এবং ভক্তদের সমাগম এক অন্য মাত্রা যোগ করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম অতিক্রম করলেও প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো ঐতিহ্য ও অগাধ বিশ্বাসকে আজও বিন্দুমাত্র ম্লান হতে দেননি স্থানীয় বাসিন্দা এবং মন্দির কর্তৃপক্ষ।