৪৮ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধ ও আকাশ থেকে সরাসরি হানা! শেষ হল ভারত-ইন্দোনেশিয়ার মেগা স্পেশাল ফোর্সেস ড্রিল ‘গারুদা শক্তি’

ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক কৌশলগত সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আয়োজিত যৌথ বিশেষ বাহিনী মহড়া ‘গারুদা শক্তি-২০২৬’ (Garuda Shakti 2026) অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সমাপ্ত হওয়া এই মেগা সামরিক মহড়াটি ছিল দুই দেশের যৌথ দ্বিপাক্ষিক মহড়ার একাদশ বা ১১তম সংস্করণ। গত ২৭ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার বানিউওয়াঙ্গির দুর্গম ভূখণ্ডে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের পক্ষে বিশ্বখ্যাত ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিজাত প্যারাসুট রেজিমেন্ট (বিশেষ বাহিনী) এবং ইন্দোনেশিয়ার পক্ষ থেকে তাদের সমকক্ষ বিশেষ বাহিনী (TNI-AD) এই কৌশলগত অনুশীলনে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

উভয় দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে অপারেশনাল সমন্বয় বৃদ্ধি করা, একে অপরের উন্নত কর্মপদ্ধতি ও কৌশলগত জ্ঞান আদান-প্রদান করা এবং যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনার সুপ্ত সক্ষমতাকে আরও বহুগুণ জোরদার করাই ছিল এই অনুশীলনের মূল উদ্দেশ্য। দীর্ঘদিনের এই সামরিক অনুশীলনের সময় দুই দেশের কমান্ডোরা ঘন জঙ্গল, বন্ধুর পাহাড় এবং দুর্গম ভূখণ্ডে একাধিক জটিল অভিযানের অনুশীলন সম্পন্ন করেন। যার মধ্যে জঙ্গল যুদ্ধ (Jungle Warfare), আকাশপথে আকস্মিক আক্রমণ (Air Assault) এবং অত্যাধুনিক ড্রোন নজরদারির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

অনুশীলন চলাকালীন দুই দেশের কমান্ডোদের অত্যন্ত কঠোর ও প্রতিকূল পরিবেশে অভিযান পরিচালনার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মূল কার্যক্রমের মধ্যে ছিল নিখুঁত যুদ্ধকালীন শুটিং, শারীরিক বাধা অতিক্রম, ঝুঁকিপূর্ণ পর্বত আরোহণ, সামরিক হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দ্রুত সৈন্য মোতায়েন, কৌশলগত টহল প্রদান এবং শত্রুর গতিবিধি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা। বিশেষ করে হেলিকপ্টার-বাহিত অভিযানের সময় সৈন্যরা আকাশপথে আক্রমণের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিখুঁতভাবে মহড়া করে দেখান। এর মধ্যে হেলিকপ্টার থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মাটিতে নেমে পড়া, অবতরণ এলাকা বা ল্যান্ডিং জোন সুরক্ষিত করা এবং নির্দিষ্ট মিশন সফল করার লক্ষ্যে গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার কলাকৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সৈন্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। অভিযান পরিচালনার সময় আকাশপথে নজরদারি চালানো, শত্রুর লুকিয়ে থাকা কার্যকলাপ শনাক্তকরণ এবং চারপাশের পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার কাজে ড্রোনের সফল ব্যবহার শেখানো হয়। পাশাপাশি, গভীর বনাঞ্চলের মাটিতে থাকা নানা সূক্ষ্ম চিহ্ন ও পায়ের ছাপ বিশ্লেষণ করে শত্রুর গতিপথ অনুসরণ করার প্রাচীন ও আধুনিক কৌশলও কমান্ডোরা দক্ষতার সঙ্গে আয়ত্ত করেন।

এই কঠোর প্রশিক্ষণের চূড়ান্ত পর্বে টানা ৪৮ ঘণ্টাব্যাপী একটি রুদ্ধশ্বাস যাচাইকরণ মহড়া পরিচালিত হয়। এই সমাপনী মহড়ায় উভয় দেশের সৈন্যরা বাস্তবোচিত ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের অনুরূপ পরিস্থিতিতে নিজেদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রদর্শন করেন। টহল প্রদান, কমব্যাট ট্র্যাকিং বা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর অনুসরণ, পার্বত্য অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা এবং বিশেষ বাহিনীর অন্যান্য বহুমুখী কৌশলের কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে এই মহড়ার সমাপ্তি ঘটে। গত ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাঁকজমকপূর্ণ সমাপনী অনুষ্ঠানে ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত এবং ইন্দোনেশীয় সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ডিভিশনের প্রখ্যাত কমান্ডার উপস্থিত ছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই মহড়ার নির্ধারিত সমস্ত কৌশলগত ও সামরিক লক্ষ্য শতভাগ সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। ‘গারুদা শক্তি-২০২৬’-এর এই ঐতিহাসিক সফল সমাপ্তি ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার বিশেষ বাহিনীগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থাকে আরও বহুগুণ দৃঢ় করেছে।