৪০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু! ইতিহাসের ৭টি ভয়ংকর বন্যা যা শুনলে শিউরে উঠবেন

মানব ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ কিছু দুর্যোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্যা। শহর, কৃষিজমি এবং আস্ত পরিকাঠামো ধ্বংস করার পাশাপাশি এই জল-বিপর্যয়গুলি কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য মানুষের প্রাণ। তবে সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনাগুলো সবসময় শুধু অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ঘটেনি; ঘূর্ণিঝড়, বাঁধ ভেঙে যাওয়া, এমনকি যুদ্ধের ময়দানে শত্রুকে আটকাতে ইচ্ছাকৃতভাবে নদীর বাঁধ ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনাও বহুবার ধ্বংসাত্মক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।
ঐতিহাসিক মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্লেষণে অবশ্য কিছুটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কারণ পুরনো শতকের রেকর্ড প্রায়শই অসম্পূর্ণ ছিল। বহু পরিসংখ্যানে শুধু জলে ডুবে মৃত্যু নয়, বরং বন্যার পরবর্তী সময়ে নেমে আসা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং বাসস্থান হারানোর জেরে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যাও যুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক এই বিপর্যয়গুলির মধ্যে সবার প্রথমে রয়েছে ১৯৩১ সালের চিন বন্যা। প্রচণ্ড ভারী বর্ষণ এবং ব্যাপক বরফ গলার ফলে ইয়াংজি, হোয়াংহো ও হুয়াই নদী উপচে মধ্য চিনের বিশাল এলাকা জলের তলায় চলে যায়। এই ঘটনায় আনুমানিক প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যার একটা বড় অংশই মারা যান বন্যার পরবর্তী সময়ে অনাহার ও রোগে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ১৮৮৭ সালের হোয়াংহো নদীর বন্যা, যেখানে প্রবল বৃষ্টির জেরে বাঁধ ভেঙে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এছাড়া ১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় চিন-জাপান যুদ্ধের সময় জাপানি সেনাদের আটকাতে হুয়ায়ুয়ানকৌ-এর কাছে চিনের জাতীয়তাবাদী বাহিনীর ইচ্ছাকৃতভাবে বাঁধ ভেঙে দেওয়ার ফলে আরও প্রায় ৯ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
তালিকায় রয়েছে ১৯৭০ সালের ভয়ংকর ভোলা সাইক্লোনও। গঙ্গা বদ্বীপের নিচু দ্বীপ এবং উপকূলীয় এলাকাগুলিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া এই ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৩ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যা উপকূলীয় অঞ্চলের চরম দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেয়। ১৬৪২ সালে চিনের কাইফেং শহর অবরোধের সময়ও সামরিক সংঘাতে ইচ্ছাকৃতভাবে হোয়াংহো নদীর বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর ঐতিহাসিক তথ্য মেলে। পাশাপাশি, ১৯৭৫ সালের আগস্টে টাইফুন নিনার প্রভাবে বানকিয়াও বাঁধ সহ একাধিক বাঁধ ভেঙে প্রায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং ১৯৭১ সালে ভিয়েতনামের রেড রিভার ডেল্টার বন্যায় প্রায় ১ লক্ষ মানুষের প্রাণহানির মতো ঘটনাগুলি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় কালো অধ হয়ে রয়েছে।
আধুনিক যুগে পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি অনেকটাই উন্নত করেছে। কিন্তু চরম বৃষ্টিপাত, উপকূলীয় বন্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আজও মানবসমাজকে বিপদের মুখে ফেলছে। এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়গুলি বারবার প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকাঠামো, উদ্ধার পরিকল্পনা এবং আগাম সতর্কতা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও একটি বিশাল মানবিক ট্র্যাজেডির মধ্যে মূল ফারাক গড়ে দিতে পারে।