রোমান্সের আড়ালে বিষাক্ত পুরুষতন্ত্র! ভারতীয় সিনেমার পর্দায় কি হিংসাকেই গ্লোরিফাই করা হচ্ছে?

১৯৫৭ সালের কাল্ট ছবি ‘মাদার ইন্ডিয়া’ আর ১৯৯৩ সালের যশ চোপড়া পরিচালিত ‘ডর’— দুটি ভিন্ন যুগের দুটি ছবি। কিন্তু এদের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম মিল রয়েছে। আর তা হলো ক্ষতিকর পুরুষতন্ত্র বা ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’-র দুই আলাদা রূপ। ‘মাদার ইন্ডিয়া’-র বিরজু চরিত্রের অন্ধ হিংসা হোক কিংবা ‘ডর’-এর রাহুলের পাগলামি— ভালোবাসা ও অধিকারবোধের নামে এই বিকৃত মানসিকতা দীর্ঘদিন ধরেই দর্শকদের মনে ভীতি ও কৌতূহল জাগিয়ে এসেছে। প্রশ্ন হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মানসিকতা কি কেবল বদলাল, নাকি বর্তমানের বিনোদন দুনিয়ায় তা আরও বেশি করে মহিমান্বিত হচ্ছে?

সিনেমা কখনই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। হয় তা সমাজের প্রতিচ্ছবি, নয়তো সমাজ ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বদল আনার চেষ্টা করে। বিশ্বের সর্বাধিক চলচ্চিত্র নির্মাতা দেশ হিসেবে ভারত বহু এমন ছবি উপহার দিয়েছে যা পিতৃতান্ত্রিক বেড়াজাল ভেঙে নারীশক্তির উত্থান ঘটিয়েছে। আবার একই সঙ্গে এমন অনেক বাণিজ্যিক ছবিও তৈরি হয়েছে যা পুরুষের বিষাক্ত আধিপত্য বা পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসনকে প্রশ্রয় দিয়েছে।

নয়ের দশক বা তার আগের ছবিতে যেভাবে এই পুরুষতান্ত্রিক অহংকার বা আধিপত্য দেখানো হতো, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কি তার মোড়ক আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে? বাণিজ্য ও বিনোদনের রঙিন মোড়কে তৈরি এই ছবিগুলোর প্রভাব কি সরাসরি পড়ছে আমাদের সমাজে?

পুরনো ক্যানভাসে পুরুষতন্ত্রের রূপ

১৯৭৮ সালের ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ ছবির কথাই ধরা যাক। সেখানে নায়কের চরিত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতি অন্ধত্ব এবং স্ত্রীর মুখ পুড়ে যাওয়ার কারণে তাকে নির্মমভাবে ত্যাগ করার মানসিকতা গভীর পুরুষতান্ত্রিক অহংকারকেই ফুটিয়ে তোলে।

কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত অভিনেত্রী গীতা দোশির মতে, নির্মাতারা অনেক সময় ভাবেন তাঁরা কাল্পনিক কিছু বানাচ্ছেন। তাঁর কথায়, “পুরুষের আধিপত্য কোন সময়ে ছিল না? আজ মেল ডমিনেন্সকে নতুন মোড়কে, অন্যরকম ফ্লেভার দিয়ে দেখানো হচ্ছে। যেটা আগেও ছিল। মেয়েরা আধিপত্য করবে, এমনটা ভাবাও যায় না। পুরুষ ভালোবাসার নামে অনেক কিছু করতে পারে আর মেয়েদের সেটা মেনে নেওয়াই রীতি— এই মানসিকতাতেই বদল আনা দরকার। পর্দায় যা দেখানো হচ্ছে, তা অন্ধের মতো না মেনে নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে বিচার করা জরুরি।”

চলচ্চিত্র নির্মাতা থেকে শুরু করে অভিনয়শিল্পীদের একাংশ মনে করছেন, রোমান্সের আবরণে মোড়া এই আক্রমণাত্মক ও বিষাক্ত মানসিকতা সমাজের নতুন প্রজন্মের মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলছে। বিনোদনের খাতিরে এই প্রবণতা এড়িয়ে যাওয়া গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে এর ফল যে খুব একটা সুখকর নয়, তা নিয়ে এখন থেকেই ভাবার সময় এসেছে।