রেকর্ড ভাঙল জ্বালানির দাম! “সব টাকা তেল-গ্যাসের পেছনে গেলে আমরা কী না খেয়ে থাকব?” হাহাকার সাধারণ মানুষের

দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম এবার একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। গত রোববার ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার। সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটার দরে। এর জেরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
মাঝারি ও নিম্ন আয়ের মানুষের হাহাকার
করোনা মহামারির পর রাইড শেয়ারিং করে কোনোমতো সংসার চালানো ঢাকার আজিমপুরের মো. আলী হোসেন বলেন, একদিকে যাত্রীর সংখ্যা কমেছে, অন্যদিকে তেলের দাম বৃদ্ধিতে খরচ আর পোষা যাচ্ছে না। কীভাবে পরিবার নিয়ে চলবেন, তা নিয়ে চরম টেনশনে রয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাকচালক হাবিবুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, “দুইদিন পরপরই তেলের দাম বাড়ায়, গ্যাসের দাম বাড়ে। তো সব টাকা যদি তেল-গ্যাসের পিছেই চলে যায়, তাহলে আমরা কি না খাইয়া থাকুম?” সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও সাধারণ পেশাজীবীদের কথা কেউ ভাবে না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকেই।
অর্থনীতি ও বাজারে মারাত্মক প্রভাবের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ কৃষি, শিল্প ও পরিবহন—সব খাতেই পড়ে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজারে সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম হু হু করে বেড়ে যাবে। এর ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পসহ ব্যবসায়ীরাও বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। এছাড়া বাস ও লঞ্চের ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণে যাতায়াত খরচও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য ও বিপিসির লোকসান
বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর এটি তৃতীয় দফায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিতে তারা বাধ্য হয়েছেন। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ফলে বার্ষিক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় দাম কম থাকায় পাচারের যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, তাও রোধ করা সম্ভব হবে বলে মত সংশ্লিষ্ট মহলের। অসাধু চক্র যেন এই সুযোগে ফায়দা লুটতে না পারে, সেজন্য বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করার আশ্বাস দিয়েছে সরকার।