রামচন্দ্র কেন শরৎকালে করেছিলেন মা দুর্গার আকাল বোধন? লঙ্কা জয়ের নেপথ্যের এই রহস্য অবাক করবে!

শারদীয় নবরাত্রি উৎসব মানেই কেবল নয় দিনের উপবাস কিংবা জমজমাট ডান্ডিয়া নাইট নয়। ত্রেতা যুগের এই মহোৎসব সরাসরি যুক্ত রয়েছে এক অমর ধর্মযুদ্ধের সঙ্গে, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অসত্যের ওপর সত্যের চিরন্তন বিজয়। প্রতি বছর আশ্বিন মাসে আমরা যে নবরাত্রি এবং বিজয়াদশমী উৎসব পালন করে থাকি, তার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন খোদ মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীরাম— লঙ্কা বিজয়ের ঠিক প্রাক্কালে। সনাতন ধর্মে শরৎকালের এই বিশেষ দেব আরাধনাকে ‘অকাল বোধন’ বলা হয়। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের মনে ঘুরপাক খাওয়া সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো— স্বয়ং নারায়ণের অবতার হয়েও শ্রীরামকে কেন অসময়ে দেবীর পুজো করতে হয়েছিল? আর রাবণ ঠিক কী এমন বর পেয়েছিলেন, যা রামের দিব্য অস্ত্রকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল?

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, লঙ্কার অধিপতি রাবণ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মহাদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত। একাধিক দৈব বর ও শক্তিতে বলীয়ান রাবণকে সাধারণ অস্ত্রে পরাজিত করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলার কৃত্তিবাসী রামায়ণ অনুযায়ী, রাবণের সঙ্গে সেই চূড়ান্ত যুদ্ধের সময় ভগবান রাম বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল যুদ্ধকৌশল নয়, লঙ্কা জয় করতে হলে মহাশক্তির আশীর্বাদ একান্ত প্রয়োজন। দেবগণের পরামশেই তিনি শরৎকালে দেবী দুর্গার বিশেষ আরাধনার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী দেবীকে আরাধনা করার প্রধান সময় ছিল বসন্তকাল বা চৈত্র নবরাত্রি। কিন্তু যুদ্ধের তাগিদে ভগবান রাম অসময়েই দেবীশক্তিকে জাগরিত করেন, যা পরবর্তীকালে ‘অকাল বোধন’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১০৮টি নীল পদ্ম ও শ্রীরামের চরম পরীক্ষা অকাল বোধনের এই পৌরাণিক কাহিনীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন অধ্যায়টি লুকিয়ে রয়েছে ১০৮টি নীল পদ্মের আরাধনাকে কেন্দ্র করে। জনশ্রুতি আছে, দেবী দুর্গার পুজো সফল করতে রামচন্দ্র ১০৮টি নীল পদ্ম সংগ্রহের সংকল্প নিয়েছিলেন। কিন্তু পুজোর চূড়ান্ত মুহূর্তে দেবী তাঁর ভক্তি ও নিষ্ঠা পরীক্ষা করার জন্য অলৌকিকভাবে একটি পদ্ম লুকিয়ে ফেলেন।

এদিকে পুজো অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার উপক্রম হতেই রামচন্দ্র চরম সিদ্ধান্ত নেন। ভক্তরা তাঁকে ভালোবেসেই ‘কমলনয়ন’ বা পদ্মলোচন বলে ডাকতেন। কারণ তাঁর চোখ দুটি ছিল পদ্মফুলের মতো সুন্দর। শ্রীরাম স্থির করেন, একটি নীল পদ্ম কম থাকায় তিনি মায়ের চরণে নিজের একটি চোখই উৎস্বর্গ করবেন! ঠিক যখন তিনি নিজের চোখ অর্পণ করতে উদ্যত হন, তখনই তাঁর এমন অনন্য ভক্তি ও আত্মত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং দেবী দুর্গা আবির্ভূত হন এবং তাঁকে থামিয়ে দেন। এরপর দেবীর আশিস নিয়েই রাবণকে বধ করে লঙ্কা জয় করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র, যা আজও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে রয়েছে।