ভারতের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল! ৪০ বিলিয়ন ডলারের ধাক্কায় কাঁপছে পাকিস্তান!

২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য স্থগিত রাখার যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পাকিস্তান সরকার নিয়েছিল, তার চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে দেশটির অর্থনীতিকে। দীর্ঘ ছয়-সাত বছর ধরে চলা এই একতরফা বয়কটের জেরে বর্তমানে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিয়েছে খোদ পাক ব্যবসায়ী সংগঠনগুলি। পাক-ইন্ডিয়া বিজনেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নূর মুহাম্মদ কাসুরি সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর বিবৃতিতে এই ভয়াবহ হিসাব তুলে ধরে বিশ্ব রাজনীতি ও বাণিজ্যের অন্দরে হুলস্থুল ফেলে দিয়েছেন।

কাসুরির বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত থেকে সরাসরি আমদানি বন্ধ থাকার কারণে পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের বর্তমানে সুদূর দেশগুলি থেকে অত্যন্ত চড়া দামে কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী আমদানি করতে হচ্ছে। এর ফলে যেমন আকাশছোঁয়া পরিবহন খরচ বাড়ছে, তেমনই নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়। বিশেষ করে পাকিস্তানের ফার্মাসিউটিক্যাল বা ওষুধ শিল্প বর্তমানে ধুঁকছে। অতীতে পাকিস্তানের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি ভারতের ওপর নির্ভর করে অত্যন্ত কম খরচে কাঁচামাল সংগ্রহ করত। কিন্তু সেই সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় তারা এখন বাধ্য হয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিকল্প বাজারের শরণাপন্ন হচ্ছে। কাসুরির স্পষ্ট দাবি, ভারত থেকে পুনরায় ওষুধ ও তার কাঁচামাল আমদানি শুরু হলে শুধুমাত্র এই একক খাত থেকেই বার্ষিক দুই থেকে তিন বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হতো।

ওষুধের পাশাপাশি পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্পও আজ চরম সংকটের মুখে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তুলার ফলন ও উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ায় মিল মালিকদের ব্রাজিল, মিশর, চিন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দূরবর্তী দেশগুলি থেকে অত্যন্ত চড়া মূল্যে তুলা আমদানি করতে হচ্ছে। এর ফলে একচেতিয়াভাবে পাকিস্তানের অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার অপচয় হয়েছে। কেবল ওষুধ বা বস্ত্রশিল্পই নয়, বর্তমান বাজারে চিনি, সার, সিমেন্ট, পেট্রোলিয়াম পণ্য, লোহা-ইস্পাত, টাটকা শাকসবজি থেকে শুরু করে ভারী শিল্পে ব্যবহৃত নানা যন্ত্রপাতিও এখন সুদূর বাজার থেকে আকাশছোঁয়া মূল্যে আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে পাকিস্তান। অথচ ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভারতেই এই সমস্ত পণ্যের প্রাচুর্য রয়েছে এবং খরচও অনেক কম। কাসুরি উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন যে ভারতের তেল শোধনাগারগুলি পাকিস্তানের ভৌগোলিক সীমানার অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত। সেখান থেকে সরাসরি পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করা হলে যাতায়াত খরচ ও সময়—উভয় ক্ষেত্রেই বিপুল সাশ্রয় হতো।

বাস্তব পরিস্থিতি এখন রাজনৈতিক সদিচ্ছার গণ্ডি পেরিয়ে ব্যবসায়িক ক্ষতির নির্মম হিসাবে এসে ঠেকেছে। রাজনৈতিক স্তরে বর্জনের জিগির তোলা হলেও চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে ব্যবসায়ীরা এখন পুনরায় বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের দাবি তুলছেন। তাঁদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য স্বাভাবিক হলে উভয় দেশের শিল্পই লাভবান হবে, পাশাপাশি বাড়বে বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ। পাকিস্তানের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট, লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচের চাপে জর্জরিত। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে ভারতীয় পণ্যের তুলনামূলক কম দাম ও সহজলভ্যতার কথা মাথায় রেখে ব্যবসায়ীদের নজর স্বাভাবিকভাবেই আবার ভারতের দিকেই ঘুরতে শুরু করেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর ভারত সরকার পাকিস্তানের ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ (MFN) বা সর্বাধিক প্রিয় রাষ্ট্রে’র মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পাশাপাশি শুল্ক বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর জেরে দুই দেশের সরাসরি বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। সেই সময় পাক রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টিকে ‘জাতীয় গর্ব’ হিসেবে তুলে ধরে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিল। কিন্তু সময়ের নির্মম পরিবর্তন বুঝিয়ে দিয়েছে যে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান ও ইগো দিয়ে বাস্তব অর্থনীতি পরিচালনা করা যায় না। দূরবর্তী দেশ থেকে অতিরিক্ত খরচ করে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছে পাকিস্তানের একের পর এক শিল্প।

বর্তমানে নূর মুহাম্মদ কাসুরির এই খোলামেলা আহ্বান পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ী মহলে এক নতুন আলোচনার ঝড় তুলেছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, দ্বিপাক্ষিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন মজবুত করতে এবং উৎপাদন খরচ তলানিতে নামাতে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য খরা কাটানো অত্যন্ত জরুরি। যদিও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক জটিলতা এবং আস্থার সংকট এখনও কাটেনি, তবুও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও মুদ্রাস্ফীতির চাপে দিশাহারা ব্যবসায়ীরা এখন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন যাতে এই আত্মঘাতী নীতি অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা হয়।