বাইরে থেকে ঋণ নেওয়ার দিন শেষ! সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় ধামাকা নবান্নের, জানুন নতুন স্কিমের সব নিয়ম

রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী আর্থিক স্বস্তির ঘোষণা করল নবান্ন। চিকিৎসার খরচ মেটানো, সন্তানের পড়াশোনার বন্দোবস্ত করা কিংবা পরিবারের যেকোনো আকস্মিক আর্থিক টানাটানি কাটাতে এবার থেকে মাসের বেতন অ্যাকাউন্টে ঢোকার আগেই প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রিম টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ মিলছে। মঙ্গলবার রাজ্যের অর্থ দফতরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই বিশেষ জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের ঘোষণা করা হয়েছে, যার পোশাকি নাম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্যালারি অ্যাডভান্স স্কিম’ (West Bengal Salary Advance Scheme)। সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ পন্থায় পরিচালিত এই ব্যবস্থা পুরো অর্থ দফতরের ই-গভর্ন্যান্স গ্রুপের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হবে।
কারা পাবেন এই প্রকল্পের সুবিধা এবং এর মূল রূপরেখা?
নবান্নের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে রাজ্যের সমস্ত নিয়মিত স্থায়ী সরকারি কর্মীরা এই প্রকল্পের প্রত্যক্ষ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। গ্রুপ ‘এ’ থেকে শুরু করে গ্রুপ ‘ডি’ পর্যন্ত—সমতুল্য সমস্ত স্তরের স্থায়ী আধিকারিক ও কর্মীরাই নিয়মানুযায়ী এই অগ্রিম পাওয়ার জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। কর্মচারীদের প্রয়োজন ও সুবিধার কথা মাথায় রেখে পুরো স্কিমটিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
১. স্বল্পমেয়াদি বা ‘শর্ট-টার্ম অ্যাডভান্স’ (Short-Term Advance): হঠাৎ কোনো জরুরি বা আপৎকালীন প্রয়োজনে নগদ টাকার সংস্থান করতে এই স্বল্পমেয়াদি অগ্রিম অত্যন্ত কার্যকরী। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মাসের মোট প্রাপ্য বেতনের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা অগ্রিম হিসেবে তুলে নেওয়ার সুযোগ থাকছে। এই টাকা সর্বোচ্চ ৬০ দিন কিংবা পরবর্তী বেতন চক্রের মধ্যেই মিটিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে এই টাকা শোধ করলে কোনো সুদ লাগবে না। এমনকি কোনো প্রসেসিং ফি, প্ল্যাটফর্ম ফি কিংবা কনভেনিয়েন্স ফি-ও কাটা হবে না। তবে কর্মচারীদের ভুলেই যদি নির্ধারিত সময়ে তথ্য দিতে দেরি হয়, তবে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ নামমাত্র ট্রানজ্যাকশন ফি ধার্য হতে পারে। তবে সরকারি দফতর বা ডিডিও (DDO)-র কারণে কোনো দেরি হলে কোনো বাড়তি ফি নেওয়া হবে না।
২. দীর্ঘমেয়াদি বা ‘মাল্টি-মান্থ অ্যাডভান্স’ (Multi-Month Advance): কোনো বড় বা দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত খরচের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে অগ্রিম নেওয়া অর্থ ২ মাস থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬০ মাস পর্যন্ত সহজ কিস্তিতে মেটানোর সুযোগ মিলছে। তবে কর্মরতদের ক্ষেত্রে এই পরিশোধের মেয়াদ কোনোভাবেই তাঁদের চাকরির অবসর সময়সীমা অতিক্রম করবে না। ঋণদাতার ঝুঁকি মূল্যায়ন (Risk Assessment) এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের (RBI) গাইডলাইন মেনে এই ঋণের সীমা নির্ধারিত হবে, যা কর্মীর মাসিক মোট বেতনের সর্বোচ্চ ৩০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। তবে একটি কড়া শর্ত রাখা হয়েছে—প্রতি মাসের ইএমআই (EMI) যেন কর্মীর মোট বেতনের ৫০ শতাংশের গণ্ডি কোনোভাবেই না পেরোয়।
স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল লেন্ডিংয়ের নিয়মাবলী
পুরো প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডিজিটাল লেন্ডিং নির্দেশিকা মেনে একটি ‘কি ফ্যাক্ট স্টেটমেন্ট’ (Key Fact Statement)-এর মাধ্যমে কর্মীদের সমস্ত সুদের হার ও চার্জ আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এছাড়া মেয়াদের মাঝে কেউ যদি সম্পূর্ণ টাকা একবারে শোধ করে দিতে চান, তবে তার জন্য কোনো ফোরক্লোজার বা প্রি-পেমেন্ট চার্জ লাগবে না।
তবে মনে রাখতে হবে, একই সঙ্গে একজন কর্মী একটির বেশি অগ্রিম সুবিধা চালু রাখতে পারবেন না। পুরনো বকেয়া সম্পূর্ণ মিটিয়ে দেওয়ার পরেই কেবল নতুন করে আবেদন করা যাবে। পুরো প্রক্রিয়াটি ডব্লিউবিআইএফএমএস (WBIFMS) এবং এইচআরএমএস (HRMS) পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। কর্মীর ডিজিটাল সম্মতির ভিত্তিতে বেতন থেকেই সরাসরি কিস্তির টাকা কেটে নেওয়া হবে। কেউ চাকরি ছাড়লে বা অবসর নিলে তাঁর চূড়ান্ত পাওনা বা গ্রাচুইটি থেকে বাকি টাকা সমন্বয় করে নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
অর্থ দফতরের এক শীর্ষ আধিকারিক এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে বলেছেন, “কর্মীদের আপৎকালীন অর্থের চাহিদা মেটাতে এবং বাইরে থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার মারাত্মক হাত থেকে বাঁচাতে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও নিরাপদ সুবিধা চালু করা হলো।” সব মিলিয়ে নবান্নের এই সময়োপযোগী ও সংবেদনশীল পদক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত খুশি রাজ্যের লক্ষাধিক সরকারি কর্মী।