বয়সের ভারে কুঁকচে যাওয়া চামড়া, চোখের কোণে উনুনের ধোঁয়া! ৩০ বছর ধরে জ্বলন্ত কড়াইয়ের সামনে লড়ে চলেছেন এই বীর যোদ্ধা

মুখের চারপাশে বয়সের স্পষ্ট ছাপ, চোখের কোণে উনুনের ধোঁয়ার জ্বালা আর ঠিক সামনেই ফুটন্ত গরম কড়াই—জীবনের এই অন্তিম পর্বে এসে যেখানে মানুষ একটু জিরিয়ে নেওয়ার বা বিশ্রামের খোঁজ করেন, সেখানে উত্তরপ্রদেশের সুলতানপুরের হৌসিলা প্রসাদ আজও পেটের দায়ে আগুনের আঁচের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। গত তিন দশক ধরে উত্তপ্ত কড়াইয়ের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে চালের লই বা মুড়ি ভাজার কাজ করে চলেছেন তিনি। পরিবারের দায়িত্ব এবং বংশপরম্পরায় পাওয়া দক্ষতাকে বাঁচিয়ে রাখার এই অদম্য লড়াই সত্যিই এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।

বংশপরম্পরায় চলে আসা কাজের ঐতিহ্য

লোকাল১৮-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হৌসিলা প্রসাদ জানান, মুড়ি বা চালের লই ভাজার এই প্রাচীন কাজটি তিনি নিজে থেকে বা কোনো বই পড়ে শেখেননি। তাঁর দাদা এবং বাবা—উভয়েই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এই কাজ করেই নিজেদের সংসার চালাতেন। ছোটবেলা থেকেই ঘরের কোণে উনুনের উত্তাপ আর মুড়ির সুবাসের মধ্যে বড় হয়ে উঠেছেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই কাজই তাঁর জীবনের না শেকড় হয়ে দাঁড়ায়। গত ৩০ বছর ধরে এই দক্ষতার ওপর ভর করেই তিনি পরিবারের ভরণপোষণ করে আসছেন। এটি তাঁর কাছে কেবল জীবিকা নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক পারিবারিক ঐতিহ্য।

মূল্যবৃদ্ধির বাজারে ফিকে হয় আয়

সময় বদলেছে, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির যুগে নিত্যদিনের সংসার চালানো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হৌসিলা প্রসাদ সারা দিন ধরে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যে মুড়ি তৈরি করেন, তার বিনিময়ে অর্জিত আয় অত্যন্ত সামান্য। উত্তপ্ত কড়াইয়ের সামনে একটানা বসে থাকার পরেও সেখান থেকে আর্থিক লাভ প্রায় নেই বললেই চলে। এমনকী পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে অনেক সময় তাঁকে নিজের সন্তানদের ওপরও নির্ভর করতে হয়। ব্যক্তিগত জীবনে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা আর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি তিনি। অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে নেমে পড়তে হয়েছিল কাজের বাজারে।

কষ্টের মাঝেও বেঁচে রয়েছে অদম্য আশা

হৌসিলা প্রসাদের জীবন কেবল একজন সাধারণ শ্রমিকের গল্প নয়, বরং এটি সেই লক্ষ লক্ষ পরিশ্রমী মানুষের বাস্তব প্রতিচ্ছবি, যারা বয়স, অভাব এবং চরম প্রতিকূলতা তুচ্ছ করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে লড়াই করে যান। চোখের ধোঁয়া বা প্রখর গরম তাঁকে সাময়িকভাবে কষ্ট দিলেও দায়িত্বের তাগিদ তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও থামাতে পারেনি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন বহু প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পেশা বা হস্তশিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন হৌসিলা প্রসাদ একাই নিজের ঘামে-রক্তে বাঁচিয়ে রেখেছেন বংশের সেই পুরনো ঐতিহ্য। তাঁর এই জীবনসংগ্রাম বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, আসল শক্তি বয়সের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা আসে প্রিয়জনদের প্রতি অটুট দায়িত্ববোধ থেকে।

Aditi Banik
  • Aditi Banik