‘প্রভাবশালী’দের নাম কি তবে ফাঁস হতে চলেছে? রিমান্ডে এসেই তদন্তকারীদের কোন বড় তথ্যের সন্ধান দিলেন সুমিত?

শালবনি জমি দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আট দিনের পুলিশ হেফাজতে থাকা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়কে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য বের করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। ভবানী ভবন সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, আট দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পর থেকেই সুমিত রায়কে ম্যারাথন জেরা করা শুরু হয়েছে এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তাঁর বক্তব্য ঘিরে তদন্তকারীদের কৌতূহল বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। রাজ্য পুলিশ সূত্রের খবর, জেরার মুখে তদন্তকারীদের একাধিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে তিনি বিভিন্ন বিষয়ের উত্তর দিচ্ছেন। তবে তাঁর দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করে এই দুর্নীতির শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পুলিশ। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৮০ নম্বর ধারায় তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করার প্রক্রিয়াও ইতিমধ্যেই শুরু করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্য পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের মতে, সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। শালবনির জমি কেলেঙ্কারিতে কোটি কোটি টাকা বিভিন্ন ভিন্‌ রাজ্য ও স্থানীয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্যে প্রমাণ মিলেছে। ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে বেশ ক’য়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন বলেও তদন্তে জোরালো ইঙ্গিত মিলছে। এই পুরো নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সুমিত রায়কে এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি ও সাক্ষী হিসেবে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁর বয়ান ও ব্যাঙ্কের হিসেব মিলিয়ে দেখার কাজ চলছে।

এই চাঞ্চল্যকর মামলার গভীরে পৌঁছাতে রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। একজন আইপিএস আধিকারিকের সরাসরি নেতৃত্বে গঠিত এই দলে দুইজন ডিএসপি পদমর্যাদার অফিসার সহ একদল দক্ষ পুলিশকর্মী রয়েছেন। মূলত সুমিত রায়ের অতীত কার্যকলাপ, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং জমি কেনাবেচার অবৈধ সিন্ডিকেটে তাঁর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখতেই এই এসআইটি গঠিত হয়েছে। তদন্তকারীদের মূল তালিকার শীর্ষে রয়েছে প্রশ্ন—কার বা কাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সুমিত এই সমস্ত অনৈতিক কাজ পরিচালনা করতেন? জমির মিউটেশন থেকে শুরু করে বড় আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে তিনি কার কার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

এর পাশাপাশি, সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে অতীতে অন্য কোনো থানায় কোনো প্রতারণা বা জালিয়াতির মামলা রুজু হয়েছিল কি না, সেই পুরনো নথিও খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। অতীতে এমন কোনো অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তদন্তকারী কে ছিলেন এবং সেই সময় সুমিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল কি না, হলে কী তথ্য বেরিয়ে এসেছিল—সবটাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শালবনি মামলার কোটি টাকার লেনদেনের উৎস এবং অন্তিম গন্তব্য কোথায় ছিল, তা স্পষ্ট করতে তাঁর বয়ানকে মূল ভিত্তি করা হচ্ছে। আট দিনের এই পুলিশ হেফাজতের মেয়াদ ফুরোনোর আগেই সুমিতের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও বেশ ক’জন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে তলব করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। সব মিলিয়ে, সুমিত রায়কে ঘিরে এই উচ্চপর্যায়ের জেরা পর্ব আগামী দিনে আরও কী কী বড় রহস্যের উন্মোচন করে, এখন সেটাই দেখার।