প্রথম ছ’মাসেই ৭ লক্ষ কোটির ঘাটতি! কেয়ারএজের চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে মোদী সরকারের আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে বড় প্রশ্ন

দেশজুড়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক নীতি নিয়ে ফের একবার তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। শীর্ষস্থানীয় ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ‘কেয়ারএজ’ (CareEdge)-এর সদ্য প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে দেশের আর্থিক পরিস্থিতির যে উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে, তাতে নড়েচড়ে বসেছে ওয়াকিবহাল মহল। রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ছ’মাসেই কেন্দ্রের রাজস্ব ঘাটতি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকায়। কর আদায়, ভর্তুকি এবং অন্যান্য খাতের বাস্তব পরিসংখ্যান তুলে ধরে এই রিপোর্ট সরাসরি বাজেটের হিসাব ও বাস্তব চিত্রের মধ্যকার বিরাট ফারাককে সামনে এনে দিয়েছে।

কেয়ারএজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে ৭ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকার এই ঘাটতি গোটা বছরের প্রস্তাবিত বাজেট লক্ষ্যমাত্রার ৪২.১ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে গত বছর একই সময়ে এই হার ছিল ৩৬.৫ শতাংশ। সংস্থার মতে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম অর্ধবর্ষে এত বড় ঘাটতি আর কখনও দেখা যায়নি। অর্থাৎ, অর্থবর্ষের অর্ধেক সময় পার হওয়ার আগেই বার্ষিক ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক খরচ হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, কেয়ারএজের আশঙ্কা, অর্থবর্ষের শেষান্তে এই ঘাটতি বাজেটের মূল লক্ষ্যমাত্রার থেকে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা পর্যন্ত বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারের সার্বিক রাজকোষ ঘাটতি জিডিপির ৪.৩ থেকে ৪.৫ শতাংশে গিয়ে পৌঁছতে পারে। যদিও এটি একটি প্রাক্কলন, তবুও এই পূর্বাভাস দেশের আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

কর আদায়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে সরকারের। বাজেটে লক্ষ্য রাখা হয়েছিল যে সামগ্রিক কর আদায় ৯.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু বাস্তবে প্রথম ছ’মাসে তা বেড়েছে মাত্র ৬.১ শতাংশ। বিশেষ করে আয়করের ক্ষেত্রে যেখানে ১৮.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেখানে মাত্র ৮..৭ শতাংশ আদায় সম্ভব হয়েছে। ফলস্বরূপ, বছর শেষে কেবল কর আদায় থেকেই প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি আদায় কমেছে ৫.৫ শতাংশ এবং আবগারি শুল্ক থেকে আয় ২২.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যেখানে বাজেটে ১৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধির আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। রাজস্ব আদায়ের এই শোচনীয় পতন সরকারের কোষাগারে বড় রকমের টান ফেলেছে।

আয়ের পাশাপাশি খরচের দিক থেকেও পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। কেয়ারএজের হিসেব অনুযায়ী, ভর্তুকি খাতে সরকারের অতিরিক্ত খরচ বাজেটের প্রাক্কলিত পরিমাণের চেয়ে ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি হতে পারে। এর মধ্যে খাদ্য ভর্তুকি ১৬ শতাংশ এবং সার ভর্তুকি ১১.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ কেন্দ্রীয় বাজেটে এই দুই খাতের খরচ কমানোর স্পষ্ট কথা বলা হয়েছিল। একদিকে রাজস্ব আয় কমে যাওয়া এবং অন্যদিকে ভর্তুকির পেছনে খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া—দুই দিকের আর্থিক চাপ একসঙ্গে এসে পড়েছে সরকারের ওপর।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের বর্তমান কৌশল নিয়েও শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। অর্থনীতিবিদ ও বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, ক্রমবর্ধমান ঘাটতি সামাল দিতে কেন্দ্র এখন সম্পূর্ণভাবে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-এর লভ্যাংশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চলতি বছরে আরবিআই-এর লভ্যাংশ হিসেবে প্রায় ২ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। পাশাপাশি, সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করে ইতিমধ্যেই ৫৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা বার্ষিক লক্ষ্যের ৭০ শতাংশ। এছাড়া আইডিবিআই (IDBI) ব্যাংকের শেয়ার বিক্রি করে আরও ২৬ হাজার কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের মতে, আরবিআই-এর লভ্যাংশ এবং সরকারি সম্পদ বিক্রি করে সাময়িকভাবে ঘাটতি ঢাকা গেলেও এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদী বা টেকসই অর্থনীতির পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর।

যদিও বিশ্ব বাজারে অস্থিরতা ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতকে এই আর্থিক পরিস্থিতির আংশিক কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে কর আদায়ে অনীহা, ভর্তুকির লাগামছাড়া খরচ এবং বাজেটের ত্রুটিপূর্ণ হিসাবই মূল সমস্যা। প্রসঙ্গত, বাজেট পেশের পর অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ১ লক্ষ কোটি টাকার একটি “ইকনমিক স্টেবিলাইজেশন ফান্ড” বা আর্থিক স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন করেছিলেন। এই আবহে বিরোধীদের বড় প্রশ্ন, তবে কি আগে থেকেই এই অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস পেয়েছিল সরকার? বছরের শেষে ঘাটতি যদি ১ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, তবে হয় ওই তহবিলে হাত দিতে হবে কিংবা বাজার থেকে বিপুল পরিমাণে ঋণ নিতে বাধ্য হবে কেন্দ্র।