প্রতিমা নয়, মন্দিরেই সাক্ষাৎ দুর্গার আরাধনা! মাছ-মাংস থেকে কাঁকড়া ভোগ—পূর্ব মেদিনীপুরের এই প্রাচীন পুজোর রহস্য জানলে চমকে যাবেন

বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোয় যখন গোটা রাজ্য মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শনে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমারের ভবানীপুরে অবস্থিত মা ঝিংলেশ্বরী মন্দিরে পালিত হয় এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পুজো। এখানে কোনো নতুন প্রতিমা তৈরি করা হয় না; বরং মন্দিরে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত দেবী ঝিংলেশ্বরীকেই স্বয়ং দুর্গারূপে কল্পনা করে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত ষোড়শোপচারে পুজো করা হয়। শত শত বছরের এই প্রাচীন পুজোকে ঘিরে রয়েছে যেমন গভীর ভক্তিবাদ, তেমনই রয়েছে রোমহর্ষক সব লোককথা ও লোকাচার।

স্থানীয় প্রবীণদের মুখে প্রচলিত ঐতিহাসিক কাহিনি অনুযায়ী, একসময়ে এই বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল নদীগর্ভে। সেই প্রাচীন যুগে যখন এই জলপথে নৌকা, বোট ও বড় বড় জাহাজ চলাচল করত, সেই সময়ে জনৈক এক রহস্যময়ী মহিলার সঙ্গে জাহাজ চালকদের কথোপকথনের মধ্য দিয়েই এই দেবীর আবির্ভাবের কাহিনি প্রচলিত হয়। স্থানীয় মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, সেই অলৌকিক মহিলা আর কেউ নন, স্বয়ং দেবী ঝিংলেশ্বরী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই ঐতিহ্য ও সংস্কার মেনেই এখানে মায়ের আরাধনা হয়ে আসছে।

এই পুজোর সবচেয়ে বড় এবং চমকপ্রদ আকর্ষণ হলো এর অনন্য ভোগ নিবেদনের রীতি ও বলিপ্রথা। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে মায়ের ভোগের থালায় চলে রকমারি পদের সমাহার। সপ্তমীতে সাত রকম, অষ্টমীতে আট রকম এবং নবমীতে ন’রকম ভাজা ও তরকারি নিবেদনের পাশাপাশি দেবীকে ঐতিহ্যগতভাবে মাছ, মাংস এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো—কাঁকড়ার মতো আমিষ পদও ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়। বিশেষ করে নদীপথে যাতায়াতকারী ট্রলার, বোট ও নৌকার মালিকেরা নিজেদের সুরক্ষা ও মনস্কামনা পূরণের আশায় দেবীর চরণে কাঁকড়া ও বলি নিবেদন করে থাকেন। ভক্তদের বিশ্বাস, এখানে মানত করলে মায়ের কৃপায় সমস্ত বিপদ কেটে যায় এবং মনের আশা পূরণ হয়।

মহাঅষ্টমীর দিন এই মন্দিরে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। ভবানীপুর তো বটেই, এমনকি পার্শ্ববর্তী হলদিয়া, তমলুক ও খাস কলকাতা থেকেও বহু দূর-দূরান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা ছুটে আসেন মা ঝিংলেশ্বরীর পুজো দিতে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের ভূপ্রকৃতি ও আধুনিকতা অনেক বদলালেও, স্থানীয় মানুষের অটুট বিশ্বাস আর প্রাচীন সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল নন্দকুমারের এই ঐতিহাসিক ঝিংলেশ্বরী মন্দিরের পুজো।