প্রতিদিনের মেট্রো সফর কি ডেকে আনছে বিপদ? আইআইটি মাদ্রাজের গবেষণায় তোলপাড়!

প্রতিদিন অফিস যাওয়া-আসা কিংবা কাজের তাগিদে ট্রেন ও মেট্রোয় যাতায়াত করেন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ। ভিড়ের মধ্যে ওঠানামা, স্টেশনের টিকিট বিক্রির মেশিনে আঙুলের ছোঁয়া কিংবা ট্রেনের ভেতরের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা— এসবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চেনা ছবি। কিন্তু এই নিত্যপরিচিত জায়গাগুলিতেই যদি লুকিয়ে থাকে এমন কিছু মারাত্মক উপাদান, যা আপনার সেবন করা অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট করে দিতে পারে, তবে আতঙ্ক ছড়ানোই স্বাভাবিক!

সম্প্রতি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT) মাদ্রাজের এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় চেন্নাই মেট্রোর বিভিন্ন স্টেশন ও ট্রেনের ভেতরে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জিন’ (ARG)-এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। শুধু চেন্নাই-ই নয়, এর আগে দিল্লির বিভিন্ন রেলস্টেশনের বাতাসের নমুনায় বিপজ্জনক সব অণুজীব ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকারী জিনের সন্ধান পেয়েছিলেন গবেষকরা।

চেন্নাই মেট্রোর ৯৬টি নমুনায় যা পাওয়া গেল

আইআইটি মাদ্রাজের গবেষকরা চেন্নাই মেট্রোর ব্লু এবং গ্রিন লাইনের ট্রেনসহ মোট ১২টি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন থেকে ৯৬টি স্পর্শকাতর নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। এর মধ্যে ৪১টি নমুনায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জিনগত উপাদান পাওয়া যায়, যা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষার ফলাফলে মোট ৭২টি পরিবারের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জিন চিহ্নিত করা গিয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ৮০ শতাংশেরও বেশি নমুনায় অন্তত একটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিনের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ধরনের জিন ব্যাকটেরিয়াকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, যার ফলে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ ওই ব্যাকটেরিয়ার ওপর আর কাজ করতে চায় না।

গবেষণায় রিফামাইসিন গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জিনও পাওয়া গিয়েছে। উল্লেখ্য, এই গ্রুপের অন্যতম প্রধান ওষুধ ‘রিফ্যাম্পিসিন’, যা যক্ষ্মা বা টিবি (TB) রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত চরম গুরুত্বপূর্ণ এক ওষুধ।

ট্রেনের হাতল বনাম টিকিট কাটার মেশিন: বেশি জীবাণু কোথায়?

গবেষণায় আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে। দেখা গিয়েছে, ট্রেনের ভেতরের হাতলের তুলনায় স্টেশনের ‘টিকিট বিক্রির ড্রপ ডাউন মেশিন’-এ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় অণুজীবের উপস্থিতি রয়েছে। প্রায় ৩০ ধরনের মাইক্রো-অর্গানিজম প্রায় প্রতিটি নমুনাতেই ধরা পড়েছে।

অবশ্য এর মধ্যে বহু ব্যাকটেরিয়াই মানুষের ত্বক, চারপাশের মাটি কিংবা স্বাভাবিক জলে সচরাচর পাওয়া যায়, যার অধিকাংশই মানবদেহের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর নয়।

কিন্তু কতটা বিপজ্জনক এই জিন? অযথা আতঙ্কের কারণ আছে কি?

গবেষকদের স্পষ্ট বার্তা— এই গবেষণার ফলাফল শুনে সাধারণ যাত্রীদের অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

কারণ, গবেষণায় ব্যাকটেরিয়ার জিনের (DNA) উপস্থিতি মাপা হয়েছে, কিন্তু সেই ব্যাকটেরিয়াগুলো জীবিত কি না, কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মানুষের শরীরে রোগ বা সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম কি না, তা পরীক্ষা করা হয়নি। তাই মেট্রোয় চাপলেই কেউ ওষুধ-অকার্যকর রোগে আক্রান্ত হবেন, এমনটা ভাবা ভুল।

শুধু চেন্নাই নয়, দিল্লির বাতাসেও জীবাণু!

গণপরিবহণে ব্যাকটেরিয়া ও জিনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা এই প্রথম নয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে ‘সায়েন্স অফ দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দিল্লির রেলস্টেশনের বাতাসের নমুনা নিয়ে একই রকম তথ্য উঠে এসেছিল।

সেখানে বাতাসের নমুনায় ‘সিউডোমোনাস’ ও ‘মোরাক্সেল্লা’-র মতো ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি রোগ ছড়াতে সক্ষম কিছু জিনের অস্তিত্ব মিলেছিল। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, আবহাওয়া, বাতাসের আর্দ্রতা ও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই অণুজীবের ধরনও বদলাতে থাকে।

যাত্রীরা কীভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখবেন?

চেন্নাই বা দিল্লির এই গবেষণাগুলি অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে— পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অণুজীবের ছোঁয়া থেকে দূরে থাকতে কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে:

১. মেট্রো বা ট্রেন থেকে নামার পর ভালো করে হাত সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করুন। ২. নোংরা বা অপরিষ্কার হাতে কখনোই চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না। ৩. যে কোনো খাবার খাওয়ার আগে হাত জীবাণুমুক্ত করা বাধ্যতামূলক করুন।

একই সাথে বিজ্ঞানের এই অ্যালার্ম বেল পরিবহণ কর্তৃপক্ষকেও সচেতন বার্তা দিচ্ছে— শুধুমাত্র চোখে দেখা নোংরা পরিষ্কার করলেই চলবে না, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক উপায়ে ট্রেনের হাতল ও টাচস্ক্রিন মেশিন ডিসইনফেক্ট করা এবং স্টেশনে বায়ু চলাচলের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান প্রয়োজনীয়।