জলের তলায় তলিয়ে যাবে ২৭টি গ্রাম! অরুণাচলে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে মেগা হাইড্রো পাওয়ার প্রজেক্ট?

অরুণাচলপ্রদেশের রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের মেগা হাইড্রো পাওয়ার প্রজেক্ট বা ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’ (SUMP)। স্থানীয় আদিবাসীদের পৈতৃক ভিটেমাটি, কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং জীবিকা বিপন্ন করে এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে কংগ্রেস। অবিলম্বে এই বিতর্কিত প্রকল্প বাতিলের জোরালো দাবি তোলার পাশাপাশি, আন্দোলনের জেরে গ্রেফতার হওয়া সমস্ত প্রবীণ ও তরুণ আন্দোলনকারীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব বিপন্ন করে কোনো উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। এলাকার সাধারণ মানুষের মতামত ও অনুমতি না নিয়ে এভাবে গায়ের জোরে প্রজেক্ট চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, বিভিন্ন সংগঠনের কণ্ঠস্বর আজ একটাই যৌথ সংকল্পে পরিণত হয়েছে—’স্টপ এসইউএমপি, সেভ সিয়াং’ (Stop SUMP, Save Siang)। এই জনবিরোধী প্রকল্পের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে রাজ্যের সমস্ত আদিবাসী সংগঠন, ছাত্র ইউনিয়ন, যুব গোষ্ঠী ও সুশীল সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
শুধু প্রকল্প বাতিলই নয়, প্রশাসনের সাম্প্রতিক দমনপীড়ন নীতির বিরুদ্ধেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কংগ্রেস। তাদের মূল দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে—বাঁধের বিরোধিতায় গ্রেফতার হওয়া সমস্ত আন্দোলনকারীকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি, অরুণাচলপ্রদেশ বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনের (APUAPA) আওতায় দায়ের হওয়া সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। একইসঙ্গে, প্রকল্পের বিরোধিতা করায় যে সমস্ত সরকারি কর্মচারী ও গ্রামপ্রধানদের অন্যায়ভাবে সাসপেন্ড করা হয়েছে, সেই নির্দেশ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট আন্দোলনরত এলাকায় মোতায়েন অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী সরিয়ে নিতে হবে। শুধু তাই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং আহত আন্দোলনকারীদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবিও জোরালো করা হয়েছে।
রাজ্য কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আর্জি জানানো হয়েছে যে, হিংসার পথ ছেড়ে আলোচনার মাধ্যমে সিয়াং অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা হোক। পাশাপাশি, সমস্ত নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
কেন এই তীব্র বিরোধিতা?
ভারতের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে পরিকল্পিত এই সিয়াং বাঁধ ঘিরে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মনে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এবং স্থানীয়দের আশঙ্কা অনুযায়ী, এই প্রজেক্টের জেরে প্রায় ২৭টি গ্রাম চিরতরে জলের তলায় তলিয়ে যেতে পারে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আরও বহু জনপদে। এর ফলে ভিটামাটি হারিয়ে উচ্ছেদ হতে হবে হাজার হাজার মানুষকে, চিরতরে নষ্ট হবে পৈতৃক জমি, সবুজ বনভূমি ও উর্বর কৃষিজমি। বিঘ্নিত হবে আদিবাসীদের শতবর্ষের চিরায়ত জীবনযাত্রা।
অন্যদিকে, ভূকৌশলগত ও সামরিক দিক থেকেও এই প্রকল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর চিনের তৈরি করা বিশাল ও উচ্চাভিলাষী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মোকাবিলায় ভারতের পক্ষ থেকে সিয়াং নদীর ওপর এই বাঁধ নির্মাণকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে কেন্দ্র। তবে একদিকে কৌশলগত নিরাপত্তা এবং অন্যদিকে স্থানীয় আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষা—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে অরুণাচলপ্রদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এখন চরমে উত্তপ্ত।