চোদ্দ প্রদীপ কোথায় রাখলে দূর হবে সংসারের অমঙ্গল? ভূত চতুর্দশীর রাতে এই বিশেষ টোটকাগুলি মেনে চললে ঘুরবে ভাগ্য

নামে ‘ভূত’ শব্দটা জড়ালেও ভূত চতুর্দশীর আসল আধ্যাত্মিক তাৎপর্য কোনো ভয় বা অন্ধবিশ্বাসের মধ্যে লুকিয়ে নেই, বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো অশুভ শক্তির বিনাশ, প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ এবং গৃহের প্রতিটি কোণে ইতিবাচক শক্তি বা আলোর সঞ্চার করা। সনাতন সংস্কৃতি ও পঞ্জিকা অনুযায়ী, কালীপুজোর আগের দিন সন্ধ্যায় পালিত হয় এই বিশেষ তিথি। এই দিনে চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানো এবং চোদ্দ শাক খাওয়ার প্রাচীন বাঙালি ঐতিহ্য রয়েছে। তবে প্রতিবারের মতো আজও অনেকের মনেই একটি বড় প্রশ্ন ঘুরেফিরে বেড়ায়—বাড়ির ঠিক কোন কোন নির্দিষ্ট জায়গায় এই চোদ্দটি প্রদীপ রাখা উচিত এবং এই দিনের বিশেষ কিছু শাস্ত্রীয় টোটকা কীভাবে মানুষের জীবন থেকে বিপদের আশঙ্কা ও অমঙ্গল দূর করতে পারে?
লোকবিশ্বাস ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভূত চতুর্দশীর পবিত্র এই রাতে নাকি স্বর্গ ও নরকের সমস্ত দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। বিশ্বাস করা হয়, এই বিশেষ সময়ে আমাদের চোদ্দ পুরুষ বা পূর্বপুরুষরা মর্ত্যে নেমে আসেন এবং তাঁদের নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে যান। এই বিশ্বাস থেকেই প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে সম্মান জানিয়ে এবং তাঁদের আত্মার চিরশান্তি কামনা করে মোট চোদ্দটি প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করার প্রাচীন প্রথা চলে আসছে। বহু বাঙালি পরিবারে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ভূত চতুর্দশী পালন করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ঘর থেকে অলক্ষ্মী ও দারিদ্র্য দূর করা এবং আলোকের রোশনাইয়ে চারপাশ ভরিয়ে তোলা। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এই চোদ্দটি প্রদীপ রাখার নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ও দিক রয়েছে।
শাস্ত্র ও লোকপ্রথা অনুযায়ী, পূর্বপুরুষদের আত্মা এবং ঘরের সমস্ত নেতিবাচক শক্তি চিরতরে দূর করার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে এই প্রদীপগুলি রাখা অত্যন্ত শুভ ও ফলদায়ী বলে মনে করা হয়:
১. ঠাকুরঘর বা পুজোর স্থান: বাড়ির পবিত্র পুজোর জায়গায় বা মন্দিরে প্রদীপ প্রজ্বলন করে দেব-দেবীর আরাধনা করা এইদিনের অন্যতম প্রধান অঙ্গ।
২. তুলসীমঞ্চ: হিন্দু ধর্মে পবিত্র তুলসীতলায় একটি প্রদীপ জ্বালানো অত্যন্ত শুভ ও আবশ্যিক বলে গণ্য করা হয়।
৩. সদর দরজা: বাড়ির মূল প্রবেশদ্বারের দু’পাশে দুটি প্রদীপ দিতে হয়। বাস্তুশাস্ত্র মতে, এই প্রদীপ দুটিতে একটি করে লবঙ্গ গুঁজে দিলে কোনো অশুভ শক্তি বা নেতিবাচক প্রভাব বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।
৪. জলের স্থান: বাড়িতে যেখানে জল বা খাওয়ার জল সংগ্রহ করে রাখা হয় (যেমন—রান্নাঘরের জলের কল, ফিল্টার বা চৌবাচ্চা), সেই স্থানটি আলোকিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
৫. মূল দরজার মাঝে: ঘরের প্রধান দরজার ঠিক মাঝখানে একটি মাটির প্রদীপে সামান্য গুড় রেখে তা জ্বালানোর বিশেষ বিধান রয়েছে, যা পরিবারে সুখ ও সমৃদ্ধি টানে।
৬. দক্ষিণ দিক: জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, দক্ষিণ দিক হলো মৃত্যুর দেবতা যমরাজের দিক। তাই নিজের সৌভাগ্য বৃদ্ধি এবং অকালমৃত্যুর ভয় ও শঙ্কা কাটাতে বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটি প্রদীপ জ্বালানো একান্ত আবশ্যক।
৭. অন্যান্য অন্ধকার কোণ: বাড়ির ছাদ, সিঁড়ির কোণ, বাথরুমের বাইরে বা যে জায়গাগুলিতে সাধারণত অন্ধকার বেশি থাকে, সেখানে বাকি প্রদীপগুলি রেখে পুরো বাড়ি আলোয় ভরিয়ে তুলতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূত চতুর্দশীর দিন সন্ধ্যার পর বাড়ির কোনো অংশ যেন ভুলেও অন্ধকারে ডুবে না থাকে। সমস্ত অন্ধকার কোণে পর্যাপ্ত আলো বা প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলে অশুভ শক্তির প্রভাব নষ্ট হয়। এছাড়া সম্ভব হলে এই পবিত্র দিনটিতে সকাল ও সন্ধ্যায় ভক্তিভরে পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ করা উচিত, যা মন, প্রাণ ও গোটা গৃহকে পজিটিভ শক্তিতে পবিত্র করে তোলে।