ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে বাঁচতে হুথিদের ইমেল! লোহিত সাগরে আজব নিয়ম দেখে চমকাবেন

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত জলপথ লোহিত সাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন এক অভিনব ও চাঞ্চল্যকর পথ বেছে নিয়েছে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজগুলি। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে বাঁচতে সরাসরি তাদের ইনবক্সে ইমেল পাঠিয়ে ‘নিরাপদ পারাপারের অনুমতি’ বা ট্রানজ়িট পারমিট চাইছে বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
ইনবক্সেই মিলছে সাত দিনের পারমিট
কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ হুথিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু কি না, তা নিশ্চিত করতে যাত্রার আগেই ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের তৈরি করা ‘হিউম্যানিটেরিয়ান অপারেশনস কোঅর্ডিনেশন সেন্টার’ (HOCC)-এর দপ্তরে মেল পাঠাচ্ছেন জাহাজের ক্যাপ্টেনরা। সাধারণত মেল পাঠানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হুথিদের কাছ থেকে উত্তর মিলছে এবং দেওয়া হচ্ছে সাত দিনের ট্রানজ়িট পারমিট।
সম্প্রতি একটি অজ্ঞাত জাহাজের ক্যাপ্টেন হুথিদের পাঠানো ইমেলে স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, তাঁদের জাহাজের সঙ্গে ইজ়রায়েল, ব্রিটেন কিংবা আমেরিকার কোনো সংযোগ নেই। তাই যেন তাঁদের নিরাপদে সমুদ্র পার হওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয়। অন্যদিকে, একটি চিনা পণ্যবাহী জাহাজের ইমেলের উত্তরে হুথিরা অত্যন্ত পেশাদার কায়দায় লেখে, “আশা করি ভালো আছেন। আমাদের জাহাজ নিষেধাজ্ঞার নিয়মগুলি আপনারা বুঝেছেন দেখে খুশি হলাম।” শুধু তাই নয়, কর্পোরেট সংস্থার মতো জাহাজের ক্যাপ্টেনদের নিয়মিত তাদের ‘ইমেল অ্যালার্ট সার্ভিস’ সাবস্ক্রাইব করার আমন্ত্রণও জানাচ্ছে বিদ্রোহীরা।
চিনা জাহাজের কৌশলী চাল ও বাড়তি খরচ এড়ানোর তাগিদ
চিনা কন্টেনার জাহাজ ‘ঝং চেং চাং লিং’-এর ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা গিয়েছে। সংস্থার নির্দেশে বাড়তি সতর্কতা হিসেবে হুথিদের সঙ্গে ইমেলে যোগাযোগ করেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। সবুজ সঙ্কেত মেলার পরই গত ৮ সেপ্টেম্বর জাহাজটি নিজেদের গন্তব্যের জায়গায় লিখে দেয় ‘সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী জাহাজে উপস্থিত’। এর পর বাব এল-মান্দেব প্রণালী পেরিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর নিরাপদে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে জাহাজটি। পুরো যাত্রাপথেই তাদের স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং সিস্টেম (AIS) চালু ছিল।
উল্লেখ্য, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ পণ্য লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু ইজ়রায়েল-হামাস সংঘাত শুরুর পর থেকেই আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইজ়রায়েল-ঘনিষ্ঠ জাহাজে লাগাতার আক্রমণ চালিয়ে আসছে হুথিরা। এই জলপথ এড়াতে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) ঘুরে গেলে অতিরিক্ত সময় এবং কোটি কোটি টাকার জ্বালানি খরচ হয়। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি বাঁচাতে অনেক সংস্থাই আন্তর্জাতিক জলপথের প্রোটোকল উপেক্ষা করে হুথিদের ইনবক্সে ছাড়পত্র চাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে।
আইনি বৈধতা না থাকলেও লোহিত সাগরে দাপট হুথিদের
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলি কোনো সশস্ত্র বা বিদ্রোহী সংগঠনের কাছ থেকে এমন অনুমোদন নেওয়ার ঘোর বিরোধী। আমেরিকার চোখেও হুথিরা একটি নিষিদ্ধ সংগঠন। ফলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা আইনি দিক থেকেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তা সত্ত্বেও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকলেও, মিসাইল ও ড্রোন হামলার ক্ষমতার জোরে লোহিত সাগরে এখন এক প্রকার অঘোষিত ‘ডিজিটাল টোল বুথ’ খুলে বসেছে ইয়েমেনের এই বিদ্রোহীরা।