কানে শুনতেন না, সেই জয়নগরের মেয়েই এখন SSKM-এর হবু ডাক্তার! কীভাবে ঘটল এই অলৌকিক কাণ্ড?

কথা বলতে বা শুনতে না পাওয়া শৈশব ভেঙে দিতে পারেনি তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে। সমস্ত প্রতিকূলতাকে হারিয়ে জয়নগরের মেয়ে সৌমিতা প্রামাণিক আজ সর্বভারতীয় নিট (NEET) পরীক্ষায় ২১৯১ র‍্যাঙ্ক করে কলকাতার মর্যাদাপূর্ণ SSKM হাসপাতালে চিকিৎসাবিজ্ঞান (MBBS) পড়ছেন। কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এই অলৌকিক সাফল্য? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সঠিক সময়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসায়।

সৌমিতার এই রূপকথার মতো সাফল্যকে সামনে রেখেই এবার রাজ্যে নতুন জন্ম নেওয়া শিশুদের শ্রবণক্ষমতা রক্ষায় বড় অভিযানে নেমেছেন শহরের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকেরা।

ছ’মাস বয়সে ধরা পড়ে সমস্যা, জীবন বদলায় ২০১২ সালে

মেয়ে যখন মাত্র ছ’ মাসের, তখন থেকেই তাঁর আচরণে অসঙ্গতি লক্ষ্য করেন মা টগরী প্রামাণিক। ডাকলে সাড়া না দেওয়া বা শব্দে প্রতিক্রিয়া না দেখানোর পর শুরু হয় একাধিক ডাক্তারের দ্বারে দ্বারে ঘোরা। পশ্চিমবঙ্গ থেকে দিল্লি—নানা জায়গায় পরীক্ষার পর ধরা পড়ে সৌমিতার মারাত্মক শ্রবণ সমস্যা। অবশেষে ২০১২ সালে ‘ককলিয়ার ইমপ্লান্ট’ (Cochlear Implant) নামক একটি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক যন্ত্র অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বসানোর পর শ্রবণশক্তি ফিরে পান তিনি।

সৌমিতার মা আবেগপ্লুত হয়ে জানান, “অনেক কষ্টের দিন পার করেছি। ডাক্তারদের পরামর্শে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হয়েছিল বলেই আজ আমার মেয়ে শুধু শুনতেই পাচ্ছে না, স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করে এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে।”

‘উজ্জ্বল শৈশব’ কর্মসূচি: পাঁচ হাজার শিশুর স্ক্রিনিংয়ের লক্ষ্য

সৌমিতার দৃষ্টান্তকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে নিউ আলিপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শুরু হয়েছে ‘উজ্জ্বল শৈশব’ প্রকল্প। একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচির লক্ষ্য আগামী এক বছরের মধ্যে অন্তত ৫,০০০ শিশুর শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের প্রাক্তন উপদেষ্টা তথা শিশু বিশেষজ্ঞ ড. অরুণকুমার সিং এবং চিকিৎসক ড. এনভেকে মোহন। কর্মসূচিতে উপস্থিত রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ আশ্বাস দিয়ে জানান, এই উদ্যোগে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সাহায্য করা হবে।

চিকিৎসকদের বড় সতর্কবার্তা: ১০০০ শিশুর মধ্যে ৯ জনই ঝুঁকিপূর্ণ!

চিকিৎসকদের পেশ করা পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তথ্য অনুযায়ী:

  • প্রতি ১,০০০ জন সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জন শিশু শ্রবণসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে জন্মায়।

  • এদের মধ্যে অন্তত ৪ জনের সমস্যা অত্যন্ত জটিল ও গুরুতর।

  • প্রি-ম্যাচিউরড (সময়ের আগে জন্ম নেওয়া) বা কম ওজনের শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতি ১,০০০ জনে প্রায় ৫০ জনের বধিরতার ঝুঁকি থাকে।

মস্তিষ্কের বিকাশ ও ‘১-৩-৬’ ফর্মুলা

ডক্টর অরুণকুমার সিং ব্যাখ্যা করেন, গর্ভাবস্থা থেকেই শিশুর মস্তিষ্ক শব্দের প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করতে শুরু করে। মস্তিষ্কের বিকাশের ‘ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড’ বা প্রাথমিক ৩ বছরের মধ্যে শিশু যদি শুনতে না পায়, তবে তার ব্রেনের একটি বড় জানলা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ককলিয়ার ইমপ্লান্ট বা হিয়ারিং এইড বসালেও ব্রেনকে নতুন করে শব্দের অভিজ্ঞতা শেখানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এই কারণে চিকিৎসকেরা ‘১-৩-৬’ মডেল জোরদার করার পরামর্শ দিচ্ছেন: ১. ১ মাসের মধ্যে: সদ্যোজাতের কানের প্রাথমিক স্ক্রিনিং। ২. ৩ মাসের মধ্যে: শ্রবণশক্তির সমস্যার সঠিক কারণ ও মাত্রা নির্ধারণ। ৩. ৬ মাসের মধ্যে: ককলিয়ার ইমপ্লান্ট বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে এখন আরও দ্রুত অর্থাৎ ‘১-২-৩’ (১ মাসে স্ক্রিনিং, ২ মাসে রোগ নির্ণয় ও ৩ মাসে চিকিৎসা) মডেল অনুসরণের চেষ্টা চলছে।

টিকাকরণের মতোই বাধ্যতামূলক হোক ‘হিয়ারিং টেস্ট’

চিকিৎসকদের দাবি, যেমন শিশুদের জন্মগ্রহণের পর নিয়মিত টিকাদান (Vaccination) করানো হয়, ঠিক তেমনই সদ্যোজাতদের ‘হিয়ারিং স্ক্রিনিং’ প্রক্রিয়াকেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিয়মিত ক্যাটাগরিতে আনা উচিত। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে হাজার হাজার শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের হাত থেকে বেঁচে যেতে পারে—যার সবচেয়ে বড় জীবন্ত প্রমাণ জয়নগরের সৌমিতা।