কাজ করলে অধিকার কেন নেই? আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১২ ঘণ্টা শ্রমদানের অভিযোগে উত্তাল ভাতার

পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের ওড়গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার শ্রীরাম টেকনোপ্যাক কারখানায় শ্রমিকদের ওপর চরম শোষণের অভিযোগ উঠেছে। দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করানো হলেও তাঁদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ। এছাড়া নেই কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF), কর্মচারী রাজ্য বিমা (ESI) কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র। এই সমস্ত একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার থেকে কাজ বন্ধ রেখে কারখানার সামনে বিক্ষোভ শুরু করেছেন ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে বুধবার সকালে শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবারের ভোরে কারখানার মূল গেটের সামনে জড়ো হয়ে তীব্র বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন কর্মীরা। তাঁদের সাফ দাবি, বছরের পর বছর ধরে এই কারখানায় কঠোর পরিশ্রম করলেও তাঁদের কাজের কোনো নিরাপত্তা বা সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি। শ্রমিকদের জোরালো অভিযোগ, দেশের শ্রম আইন অনুযায়ী যেখানে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম নির্ধারিত রয়েছে, সেখানে তাঁদের জোর করে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত খাটানো হচ্ছে। অথচ এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য কোনো ওভারটাইম বা উপযুক্ত পারিশ্রমিক মিলছে না। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার পরেও অধিকাংশ শ্রমিকের হাতে নেই কোনো অফিশিয়াল নিয়োগপত্র বা পরিচয়পত্র। পিএফ এবং ইএসআইয়ের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও তাঁদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা হয়েছে। এমনকি একই কারখানায় সমান কাজ করা সত্ত্বেও মজুরির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে বলে চাঞ্চল্যকর দাবি তুলেছেন কর্মীরা।

কারখানার এক বিক্ষুব্ধ শ্রমিক সুজিত গড়াই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাঁরা যখনই নিজেদের মৌলিক দাবি-দাওয়া নিয়ে কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়েছেন, তখনই তাঁদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। ন্যায্য মজুরি কিংবা আইনি সুযোগ-সুবিধার কথা তুললে উল্টে কাজ কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের আন্দোলন বা প্রতিবাদে শামিল হওয়া থেকে আটকাতে তাঁদের বাড়িতে গিয়েও নানারকম ভয় দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই স্বেচ্ছাচারিতা চললেও কারখানা কর্তৃপক্ষ সমস্যার সমাধানে কোনো সদর্থক পদক্ষেপ করেনি।

আরেক শ্রমিক সুমন বাগদি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কারখানার ভিতরে উৎপাদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া বা সংস্থার কোনো রকম আর্থিক ক্ষতিসাধনের জন্য এই আন্দোলন নয়। বরং তাঁরা নিজেদের কঠোর পরিশ্রমের ন্যায্য অধিকার এবং কর্মক্ষেত্রে সঠিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই কর্মবিরতির পথ বেছে নিয়েছেন। শ্রমিকদের মতে, কারখানার অভ্যন্তরে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কর্মীর হাতে বৈধ পরিচয়পত্র বা প্রয়োজনীয় নথি না থাকায় আইনি বা প্রশাসনিক সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

ইতিমধ্যেই শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এলাকার সহকারী শ্রম আধিকারিকের কাছে একটি লিখিত দাবিদাওয়া পেশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। কাজের উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ, সুরক্ষামূলক পোশাক ও সরঞ্জাম সরবরাহ, নির্দিষ্ট কর্মসময় মানা, বকেয়া পারিশ্রমিক পরিশোধ এবং অবিলম্বে পিএফ ও ইএসআইয়ের সুবিধা চালুর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। দাবিগুলি পূরণ না হলে এই আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। এই পরিস্থিতিতে কারখানার অচলাবস্থা কাটাতে এবং শ্রমিকদের সমস্ত বৈধ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ওয়াকিবহাল মহল।