ওপারে বন্দি দীপঙ্কর, এপারে আঁধারে কোণঠাসা পরিবার! ক্ষোভ আর কান্নায় ভাসছে জলপাইগুড়ির গোপ বাড়ি!

উৎসবের আলোয় চারদিক আলোকিত হওয়ার কথা থাকলেও জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের চাউলহাটির তসরপাড়ার গোপ পরিবারে এখন নেমে এসেছে বিষাদের নিকষ কালো অন্ধকার। বিদেশের জেলে বন্দি দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের বড় ছেলে। তাঁর শূন্যতা এবং চরম উৎকণ্ঠার জেরে এই প্রথম শতাব্দী প্রাচীন পারিবারিক কালীপুজো বন্ধ রাখার অভিশপ্ত সিদ্ধান্ত নিল গোপ পরিবার। স্বামী বা বাবা ঘরে না ফেরা পর্যন্ত উৎসবে সামিল হতে নারাজ তারা।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই সংকট?
গত ৮ আগস্ট জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের চাউলহাটির তসরপাড়ার বাসিন্দা দীপঙ্কর গোপ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াগেঁষা ভারতীয় ভূখণ্ডের একটি চা বাগানে কীটনাশক স্প্রে করতে গিয়েছিলেন। অভিযোগ, সেই সময়ই ওপার বাংলার একদল দুষ্কৃতী তাঁকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁকে তুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (BGB)-এর হাতে। পঞ্চগড় থানা হয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের ভুয়া অভিযোগে বর্তমানে বাংলাদেশের জেলেই বন্দি রয়েছেন দীপঙ্কর। তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।
পরিবারের অভিযোগ, এর আগে গত ৬ আগস্ট ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়া তজিমুদ্দিন ইসলাম নামের এক বাংলাদেশি চোরাচালানকারীকে বিএসএফ ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। সেই চোরাচালানকারীকে ছাড়িয়ে আনতেই ওপার থেকে এসে দীপঙ্করকে অপহরণ করে নিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। স্পষ্ট শর্ত দেওয়া হয়, ভারতীয় জেলের বন্দি তজিমুদ্দিনকে না ছাড়া হলে মুক্তি মিলবে না দীপঙ্করেরও। যদিও সেই চাপানউতোরের মাঝেও আজ তিন মাস ধরে চরম মানসিক যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি। দীপঙ্করের বৃদ্ধ বাবা মিশ্রীলাল, স্ত্রী মহামায়া, ভাই শুভঙ্কর ও দুই ছোট ছেলে প্রণব ও ঋষির চোখে এখন কেবল জল।
“বাড়ির হাসি-খুশিটাই তো চলে গিয়েছে”—কান্নায় ভাঙলেন স্ত্রী
সংবাদমাধ্যমের সামনে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে দীপঙ্করের স্ত্রী মহামায়া গোপ জানান, “আমার স্বামী তিন মাস ধরে বিদেশের জেলে বন্দি। কবে ফিরবে কেউ জানে না। আমাদের বাড়ির বাৎসরিক কালীপুজো এবার আর হবে না। কারও মন-মেজাজ ভালো নেই। ছোট ছেলেটা প্রতিদিন বাবার জন্য কেঁদে জানতে চায়, কিন্তু আমার কাছে কোনো উত্তর থাকে না।”
অন্যদিকে ভাই শুভঙ্কর গোপ জানান, তাঁদের পরিবারে বংশপরম্পরায় এই কালীপুজো হয়ে আসছে। ঠাকুরদার ঠাকুরদার হাত ধরে শুরু হওয়া শতবর্ষের এই প্রাচীন ঐতিহ্য এই প্রথমবার ভাঙতে হচ্ছে। বাড়ির কারও মনে শান্তি নেই, তাই এই অবস্থায় মা কালীর আরাধনা করা সম্ভব নয়।
কী বলছে প্রশাসন?
গোটা বিষয়টি নিয়ে জলপাইগুড়ির সাংসদ জয়ন্ত রায় জানিয়েছেন, দীপঙ্করকে দ্রুত সসম্মানে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা চলছে। জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকেও এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাঁকে ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে বলে আশ্বাস মিলেছে। তবে কবে সেই সূর্য উঠবে এবং কবে ফের গোপ পরিবারে আলো ফিরবে, আপাতত সেই আশাতেই দিন গুনছে গোটা জলপাইগুড়ি।