এক ঘণ্টায় সাতটি পোস্ট! ইরানের মানচিত্রে নিজের মুখ বসিয়ে কী এমন করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প?

এক ঘণ্টার মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় মোট সাতটি আক্রমণাত্মক পোস্ট করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কখনও এআই (AI) নির্মিত ছবি আবার কখনও নিজের অবয়বকে ইরানের মানচিত্রের উপর বসিয়ে তেহরানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও রাজনৈতিক চাপ দ্বিগুণ করেছেন তিনি। দুই দেশের মধ্যে চলা এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ক্রমশ যে আরও বেশি ব্যক্তিগত ও আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করছে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলি তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।

রবিবার জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একের পর এক বিস্ফোরক পোস্ট করে ইরানের উপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টির এই অভিনব প্রচেষ্টা চালান ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশের তলানিতে গিয়ে ঠেকে যাওয়া দুর্বল মুদ্রা, লাগাতার কমে যাওয়া তেল রফতানি এবং ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা জ্বালানি পরিকাঠামোর ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি মূলত বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমেরিকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে পড়ে তেহরান এখন কোণঠাসা। বিশেষ করে এই পোস্ট-বন্যার মাত্র কয়েক দিন আগেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নাম বদলে ‘ট্রাম্প প্রণালী’ করার ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনার পারদকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

ট্রাম্পের শেয়ার করা এই ধারাবাহিক পোস্টগুলির মধ্যে প্রথম দিকে ছিল একটি অত্যন্ত প্রতীকী ও বিতর্কিত ছবি। ইরানের ভৌগোলিক মানচিত্রের ঠিক ওপরের অংশে নিজের মুখ বসিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে মার্কিন আধিপত্যই বজায় রয়েছে। এরপর একে একে তেল পরিবহণ ও বাণিজ্যের বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেন তিনি। হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত একটি গ্রাফিক শেয়ার করে তিনি দাবি করেন যে, ওই জলপথ দিয়ে তেল পরিবহণের পরিমাণ বর্তমানে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও যুদ্ধের আগের তুলনায় পরিস্থিতি অনেকটাই শোচনীয়। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, তেল পরিবহণের পরিমাণ বেড়ে দৈনিক ১ কোটি ৮০ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছালেও সংঘাতের আগের দৈনিক ২ কোটি ব্যারেলের হিসাব থেকে তা এখনও যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। এরপর সরাসরি তেহরানের তেল-রাজস্বের ধস নামার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি লেখেন, “ইরানের তেল রফতানি পুরোপুরি ধসে পড়ছে!”

ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং মুদ্রার রেকর্ড পতন নিয়েও তীব্র কটাক্ষ করতে ছাড়েননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ইরানের মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর ব্যাপক দরপতনকে কেন্দ্র করে একটি গ্রাফিক প্রকাশ করে তিনি লেখেন, “ইরানে ভয়াবহ অতি-মুদ্রাস্ফীতি চলছে।” সেখানে মার্কিন ডলারের তুলনায় ইরানি রিয়ালের মূল্যের অবিশ্বাস্য পতনের তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রদর্শিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে যে মুদ্রার বিনিময়মূল্য ছিল প্রায় ৯ লক্ষ রিয়াল, তা লাফিয়ে বেড়ে ২২ লক্ষ ৭০ হাজার রিয়ালেরও বেশি গিয়ে ঠেকেছে। পরবর্তী আরেকটি গ্রাফিকে আরও আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে লেখা হয়, “ইরানের মুদ্রা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে!” ১০ লক্ষ রিয়ালের বিপরীতে ডলারের এই ভয়াবহ পতন তেহরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে বলে তাঁর দাবি।

তবে এই ঝড়ের এখানেই শেষ হয়নি। ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপকে সরাসরি নিশানা করে একটি অত্যন্ত প্ররোচনামূলক ও উসকানিমূলক এআই-নির্মিত ছবি বা গ্রাফিক শেয়ার করেন ট্রাম্প। “বিদায় বিদায়, খার্গ” শিরোনামের ওই ছবিতে দেখা যায়, প্রলয়ংকর বিস্ফোরণ ও লেলিহান আগুনে পুড়তে থাকা একটি বিশাল তেল পরিকাঠামোর দিকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসছে একটি সামরিক যুদ্ধবিমান। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, খার্গ দ্বীপের ওপর এই ধরনের সম্ভাব্য হামলার সরাসরি ইঙ্গিত দিয়ে তেহরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার কথাই বোঝাতে চেয়েছেন ট্রাম্প। উল্লেখ্য, ইরানের তেল রফতানির সিংহভাগই এই দ্বীপের ওপর নির্ভরশীল, ফলে এখানকার পরিকাঠামো ধ্বংস হলে তেহরানের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

পরিশেষে, ইরানকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করে একটি চূড়ান্ত মন্তব্য সম্বলিত গ্রাফিক পোস্ট করে এই তাণ্ডব শেষ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। দেশের মানচিত্রযুক্ত ওই শেষ পোস্টটিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল, “ইরান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে!” সব মিলিয়ে, একের পর এক তেল বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, রিয়ালের রেকর্ড পতন, জ্বালানি পরিকাঠামো ধ্বংসের প্রকাশ্য হুমকি এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে ইরানকে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পঙ্গু এক দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে চাইছে হোয়াইট হাউস।