অভিনয়ের লোভ দেখিয়ে সুকৌশলে সর্বস্বান্ত! টলিউড পরিচালকের নাম ভাঙিয়ে এই জালিয়াতির আসল রহস্য কী?

সিনেমা জগতের আলো ঝলমলে দুনিয়ায় পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার স্বপ্ন কার না থাকে? কিন্তু সেই স্বপ্নকেই যখন এক শ্রেণির প্রতারক হাতিয়ার করে তোলে, তখন তা সাধারণ মানুষের জন্য এক ভয়ানক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়। সম্প্রতি টলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় পরিচালক তথা বিধায়ক রাজ চক্রবর্তীর নাম এবং তাঁর গলা নিখুঁতভাবে নকল (Voice Cloning) করে এক উচ্চাশা সম্পন্ন যুবকের কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর সাইবার জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে। আধুনিক প্রযুক্তির চরম অপব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে কীভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে, এই মর্মান্তিক ঘটনা তার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। বিনোদন জগতের নাম ভাঙিয়ে এই অভিনব কাস্টিং স্ক্যামের খবর প্রকাশ্যে আসতেই গোটা টলিপাড়ায় চরম শোরগোল ও তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।

পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, প্রতারণার এই অন্ধকার জালে জড়িয়ে পড়া ওই যুবকের নাম শুভজিৎ ঘোষ দস্তিদার। তিনি সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি নামী শীর্ষস্থানীয় প্রযোজনা সংস্থার নামে তৈরি করা একটি আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখতে পান, যেখানে নতুন ও উঠতি অভিনেতাদের খোঁজে একটি ঐতিহাসিক পটভূমির প্রজেক্টের জন্য কাস্টিংয়ের কথা বলা হয়েছিল। সেই বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে শুভজিৎ যখন নির্দিষ্ট ঠিকানায় যোগাযোগ করেন, তখন স্ক্যামাররা তাঁকে একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে দাবি করে যে এটি খোদ পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর ব্যক্তিগত নম্বর এবং তাঁর কাছেই নিজের ছবি ও প্রোফাইল পাঠিয়ে দিতে হবে। শুভজিৎ সেই নির্দেশ মতো ছবি পাঠানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর কাছে একটি ফোন আসে। ফোনের ওপার থেকে যিনি কথা বলেন, তিনি নিজেকে রাজ চক্রবর্তী বলেই পরিচয় দেন। অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং ভয়ের বিষয় হলো, ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তির স্বর, কথা বলার ভঙ্গি, উচ্চারণ এবং গলার টোন অবিকল রাজ চক্রবর্তীর মতোই ছিল। পরবর্তীতে শুভজিৎ বুঝতে পারেন যে, প্রতারকরা অত্যন্ত সুকৌশলে এআই (AI) ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালকের গলা নিখুঁতভাবে নকল করে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিল। শুধু তাই নয়, যে সোশ্যাল মিডিয়া পেজ বা প্রোফাইল থেকে প্রাথমিক বিজ্ঞাপনটি দেওয়া হয়েছিল, সেটিও সম্পূর্ণ ভুয়া বা ফেক বলে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতারকরা তাদের পাতা জাল আরও বিস্তার করতে শুভজিতের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে একটি বড় মাপের ঐতিহাসিক প্রজেক্টে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের লোভ দেখায়। প্রোফাইল শুট এবং আইনি চুক্তিপত্রের কথা বলে প্রথমে এনরোলমেন্টের নামে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এরপর বিশ্বাসযোগ্যতা শতভাগ বাড়াতে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ওই প্রযোজনা সংস্থার একাধিক জাল নথি এবং কাস্টিং কন্ট্র্যাক্ট বা চুক্তিপত্রও পাঠানো হয়। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে প্রোফাইল শুট এবং গ্রুমিংয়ের নাম করে শুভজিৎ ও অজিতা নামের বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দফায় দফায় আরও ৯২ হাজার, ৫০ হাজার ও ৪২ হাজার টাকা ট্রান্সফার করিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে বিভিন্ন অছিলায় মোট ২ লক্ষ টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয় ওই যুবকের কাছ থেকে। এরপর প্রতারকদের লোভ যখন আরও বাড়তে থাকে এবং তারা নতুন করে ৮৫ হাজার টাকা দাবি করে, তখন শুভজিতের মনে তীব্র সন্দেহ দানা বাঁধে। তিনি তাঁর পরিচিত কিছু অভিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারেন যে তিনি এক বিশাল সাইবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে ওই যুবক কালবিলম্ব না করে দক্ষিণ কলকাতার বাঁশদ্রোণী থানায় একটি সুনির্দিষ্ট এফআইআর (FIR) দায়ের করেন। তিনি পুলিশকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান যাতে এই ধরনের সংগঠিত অপরাধ অবিলম্বে বন্ধ করা যায়। অভিযোগ পাওয়ার পরই নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ ও সাইবার ক্রাইম সেল। প্রতারকদের ব্যবহৃত সন্দেহজনক ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলির ট্রানজ্যাকশন হিস্ট্রি এবং মোবাইল নম্বরের কল ডিটেলস (CDR) ট্র্যাক করে অপরাধীদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করার জন্য জোরকদমে তদন্ত শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিনেমা জগতে সুযোগ পাওয়ার শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে গিয়ে যেভাবে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সাইবার অপরাধীরা সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছে, তা ভবিষ্যতে তরুণ প্রজন্মের জন্য এক মারাত্মক অশনি সংকেত হয়ে উঠতে পারে।