“ইংরেজি হোক বিদেশি মাসি!” মাতৃভাষাকে ছোট করায় বিচারপতির চোখে জল, আদালতের ভাষা নিয়ে চরম তোলপাড়!

সাংবিধানিক ও ভৌগোলিক স্বাধীনতার দীর্ঘ প্রায় আট দশক অতিক্রান্ত হলেও, ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে যে ভারত আজও সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি, তা ফের একান্তে স্পষ্ট করে দিল বিচারব্যবস্থার অন্দরমহল। সম্প্রতি অবসরের ঠিক প্রাক্কালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি গৌতম চৌধুরীর একটি বিদায়ী ভাষণ দেশজুড়ে এক নতুন ও তীব্র ভাষাগত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। হিন্দিতে দেওয়া তাঁর সেই আবেগঘন ভাষণে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনশো বছর ধরে শাসন করা ব্রিটিশদের ভাষার প্রতি ভারতীয়দের এই অন্ধ দাসত্ব মানসিকতা এবার বদলানোর সময় এসেছে।
বিচারপতি চৌধুরীর মতে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিদেশি ভাষার ঘোর বিরোধী নন। তবে নিজের মাতৃভাষাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকার প্রবণতা তাঁকে চরমভাবে আঘাত করে। অত্যন্ত রূপক অর্থে তিনি মন্তব্য করেছেন, সমস্ত ভারতীয় ভাষাই আমাদের আপন মাসির মতো, আর ইংরেজি হোক বিদেশি এক মাসি। মাসিদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু নিজেদের মাতৃভাষার বুক চিরে বিজাতীয় ভাষাকে সিংহাসনে বসানোর এই অন্ধতা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। তাঁর সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন, একদিন পশ্চিমবঙ্গের আদালতে বাংলায় এবং গুজরাটের আদালতে গুজরাতি ভাষাতেই সমস্ত আইনি রায় ও কার্যক্রম পরিচালিত হবে। হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে হিন্দির ব্যাপক প্রসারের পক্ষেও জোরালো সওয়াল করেছেন তিনি।
বিচারব্যবস্থার তৃণমূল স্তর থেকে উঠে আসা বিচারকদের উদ্দেশে বিচারপতি গৌতম চৌধুরী এক বাস্তবসম্মত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, জেলা আদালতগুলিতে যদি স্বাচ্ছন্দ্যে হিন্দিতে সমস্ত কাজ করা সম্ভব হয়, তবে হাইকোর্টে এসে হঠাৎ ইংরেজিতে লেখার এই বাধ্যতামূলক প্রবণতা কেন তৈরি হবে? অনেকেরই এই ভুল ধারণা রয়েছে যে, ইংরেজিতে রায় লিখলে বুঝি তা অনেক বেশি মার্জিত বা আইনসিদ্ধ দেখায়। অথচ নিজের সুদীর্ঘ ও বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি হাজার হাজার রায় হিন্দিতে লিখে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, মার্জিত চিন্তা এবং আইনি গভীরতা ঠিক ততটাই সুন্দরভাবে নিজের মাতৃভাষায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
এই মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক সত্য। স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত, উচ্চশিক্ষা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার সিংহভাগ জুড়ে এখনও ইংরেজির একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রয়েছে। আদালতের বারান্দায় যখন একজন সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষ এসে দাঁড়ান, তখন বিচারালয়ের ভাষা বোধগম্য না হওয়ার কারণে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও অসহায় বোধ করেন। বিচারব্যবস্থা যদি সাধারণ মানুষের বোধগম্য মাতৃভাষায় পরিচালিত না হয়, তবে সেই ন্যায়বিচার কতটা সহজলভ্য ও গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, তা নিয়ে আজ বহু প্রশ্নচিহ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
অবশ্য এই বিতর্কের অন্য দিকটিও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা যায় না। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি ভাষা কেবল একটি ঔপনিবেশিক প্রতীক নয়, এটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এক শক্তিশালী সেতুও বটে। বহুভাষিক ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে ভাব বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হিসেবেও ইংরেজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টে যদি প্রতিটি রাজ্যের মামলা নিজ নিজ আঞ্চলিক ভাষায় বিচার করা শুরু হয়, তবে আইনি জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সমান্তরালভাবে অন্য মতটিও জোরালো যে, নিজের মাতৃভাষায় বিচার ও আইনি চর্চা না হলে দেশের সাধারণ মানুষের মনে আত্মমর্যাদা ও প্রকৃত আত্মবিশ্বাস জন্ম নিতে পারে না। ভাষা কেবল মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম মাত্র নয়, এটি আক্ষরিক অর্থেই প্রতিটি মানুষের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।